ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নদ-নদীর গতিপথও বদলে যায়। ঠিক তেমনি ঋতুর সঙ্গে বদলে যায় দুর্গম যমুনা চরের মানুষের পেশা। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার যমুনা চরে বসবাসকারী মানুষের জীবন যেন রাষ্ট্রের চোখের আড়ালে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও তাদের দুর্দশা নিরসনে নেই কোনো কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ।
যমুনা নদীর চরাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ। তারা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করছে, বিশেষ করে নদীর নিষ্ঠুর ভাঙনের সঙ্গে। যমুনা চরসহ নদীপাড়ে বসবাসকারী এসব মানুষ নদীর গতি-প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বেঁচে থাকতে চায়। অভাব-অনটন আর ক্ষুধার যন্ত্রণা সঙ্গী হলেও তারা চর ছাড়তে নারাজ। নদীর টানেই চরের মানুষ আশায় বুক বেঁধে পড়ে থাকে ভাঙা ও জীর্ণশীর্ণ ঘরে। যে নদী দিনের পর দিন তাদের সর্বস্ব গ্রাস করেছে, সেই নদীকেই ঘিরে তাদের বুকভরা আশা—হারিয়ে যাওয়া জমি আবার জেগে উঠবে।
শত দুঃখ-যন্ত্রণা ও অভাব-অনটনের মধ্যেও তারা চরের মাটিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাদের বিশ্বাস, ভাঙা-গড়া নদীরই খেলা। বছরের পর বছর নদীভাঙনের কারণে বারবার বসতবাড়ি স্থানান্তর করতে হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধে টেকসই বাঁধ বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
চরবাসীদের মতে, বর্ষাকালে উত্তাল নদীর স্রোতধারায় নদীগর্ভে জমে উর্বর পলি। শুষ্ক মৌসুমে সেই নরম পলিতে তারা ফসল ফলায়। নদী যেমন দুঃখ দেয়, কেড়ে নেয় বসতবাড়ি ও আবাদি জমি, তেমনি নদীই আবার তাদের সৌভাগ্য বয়ে আনে। জমি হারানোর ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পরিবারগুলো চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়লেও শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা বালুচরে মরিচ, ধান, পাট, চীনা, কাউন, বাদাম, তিল ও তিসি চাষ করে আবার স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে তারা।
এছাড়াও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা পেশা বদলায়। কোনো সময় জেলে, কোনো সময় নৌকার মাঝি, আবার কোনো সময় কৃষক। কখনো ঘাটে ঘাটে কুলি-মজুরের কাজ করেও জীবিকা নির্বাহ করে।
চরবাসী রিপন মণ্ডল বলেন, “এই জীবনে শান্তি নাই। কখন নদী ঘর নিয়ে যাবে বলা যায় না। ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে পারি না। অসুস্থ হলে নৌকায় করে শহরে নিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।” তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ এসব এলাকায় নেই কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগকালে ত্রাণ এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন নারীরা। নিরাপদ প্রসব ও চিকিৎসাসেবার অভাবে মাতৃত্ব হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদ্যালয় সংকট ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চরবাসীদের দাবি, শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে এ অঞ্চলটি বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে।
এলএইচ/আরএন