প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় মৌলভীবাজারের নির্বাচনী মাঠে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা গাছপালায় নেই পোস্টার বা ব্যানার। এতে একদিকে যেমন কমেছে প্রচারণার জৌলুস ও নির্বাচনী উচ্ছাস, অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বস্তি প্রকাশ করছেন অনেক ভোটার।
জেলা জুড়ে চারটি সংসদীয় আসনে এবার পোস্টারবিহীন প্রচারণায় নির্বাচনী আমেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হলেও এর প্রভাব পড়েছে প্রচার কার্যক্রমে। অনেক ভোটারই এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, কে প্রার্থী, কোন প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া প্রচারণা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অপচনশীল দ্রব্য যেমন পলিথিন, প্লাস্টিক বা রেক্সিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে কোনো ধরনের ফেস্টুন বা পোস্টার টাঙানোও নিষিদ্ধ।
সরেজমিনে মৌলভীবাজারের আসনগুলোর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ‘প্রার্থীরা মূলত উঠান বৈঠক, মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে এসব কার্যক্রম গ্রামাঞ্চলের সব ভোটারের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
সংসদীয়-৩ আসনের রাজনগর উপজেলার উয়াদীঘি হাওরপারের কৃষক মজবিল মিয়া বলেন, ‘আগে পোস্টার দেখেই বুঝতাম কে প্রার্থী। এখন তেমন কিছু চোখে পড়ে না। বয়স্ক মানুষের জন্য বিষয়টা কঠিন হয়ে গেছে।’
মৌলভীভাজা-৪ আসনের চা শ্রমিক শুভ গোয়ালা জানান, ‘অনলাইনের প্রচার বুঝি না। স্মার্টফোনও নাই। পোস্টার থাকলে চিনতাম, কে কে দাঁড়াইছে।’
মৌলভীবাজার-১ আসন এলাকার ভোটার মফিজ মিয়া বলেন, ‘আগে পোস্টার দেখলেই বুঝতাম ভোট আসছে। এবার চারদিকে তাকিয়ে কিছুই দেখা যায় না।’
মৌলভীবাজার-২এর নতুন ভোটার পৌর এলাকার ভোটার শিল্পীরানী ভাষ্য, ‘কে প্রার্থী, কোন মার্কা—সব পোস্টার দেখেই জানতাম। এখন ফেসবুক না দেখলে কিছু বোঝা যায় না।’ তিনি বলেন, আমি নতুন ভোটার হিসেবে যে আমেজ পাওয়ার কথা সেটা পাইনা।’ তার মত নতুন ভোটার রাতুল হক বলেন, ‘পোস্টার শুধু টাকা নষ্ট করে। ফেসবুক আর উঠান বৈঠকই যথেষ্ট। মানুষকে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।”
এদিকে একই কথা বলছেন দিনমজুর ভোটার শফিক মিয়া বলেন, ‘আগে পোস্টারেই নির্বাচন বোঝা যেত। এবার আমেজটাই নাই।’
তবে তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের একটি অংশ এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কলেজ শিক্ষার্থী রেশমি জাহান বলেন, ‘পোস্টার না থাকায় পরিবেশ নোংরা হচ্ছে না। রাস্তাঘাট পরিষ্কার থাকছে।’
পরিবেশকর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক সোহেল শ্যাম বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রচারণায় গাছ ও দেয়াল নষ্ট হতো। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন অনেক পরিচ্ছন্ন থাকছে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘পোস্টারহীন প্রচারণা পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নির্বাচনের পর বর্জ্যের যে পাহাড় তৈরি হতো, এবার তা এড়ানো যাচ্ছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা জানান, ‘পোস্টার ছাড়া প্রচারণা নতুন অভিজ্ঞতা হলেও এতে প্রান্তিক ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘পোস্টারহীন প্রচারণা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও এবারের নির্বাচনে তা নির্বাচনী আমেজ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, নতুন কৌশলে ভোটারদের সম্পৃক্ত করাই হবে প্রার্থীদের বড় চ্যালেঞ্জ।’
মৌলভীবাজার-৪ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল আসনের ভোটাররা সচেতন। সঠিক প্রার্থীকে ভোট দিবে। পোস্টার ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে পরিচয় করা লাগবে না। কারণ আমরা তাদের ধারে ধারে গিয়ে ভোট চাচ্ছি।’
এসএস/এসআর