Wednesday | 3 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Wednesday | 3 June 2026 | Epaper
BREAKING: পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ নয়: প্রধানমন্ত্রী      বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা কাল      মা-বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তোফায়েল আহমেদ      দেশে হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু      কমলো এলপি গ্যাসের দাম      আদালতের বাইরে আসামির কথা বলা ও প্রচার না করতে নির্দেশনা      পশ্চিমবঙ্গের সরকারে নেই মুসলিম প্রতিনিধি      

স্বাধীন দেশের মাটিতে মওলানা ভাসানীর প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ: বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:০৮ পিএম   (ভিজিট : ১৩৯)

০১) ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। একসাগর রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ও লাল-সবুজের পতাকা। পরের বছর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানে কারাবাস শেষে প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। নয় মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় কিছুটা পূর্ণতা লাভ করে। এই পূর্ণতার মধ্যেও ছিল বিশাল শূন্যতা। কারণ, তখনও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর দেশের মাটিতে আসেননি।

প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১২ দিন পর যখন ঢাকার পত্রপত্রিকায় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে নানা ধরনের লেখালেখি শুরু হয়, তখন ভারতের সরকার মওলানা ভাসানীকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে। তিনি যখন নিজ দেশের মাটিতে ফিরছিলেন, তখন তাঁর স্বাস্থ্য বিশেষ ভালো ছিল না। দিল্লি থেকে দেশে ফেরার আগে তিনি আসাম যান। সেখানে তাঁর পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি তিনি ভারত সরকারের কাছে চেয়েছিলেন। ভারত সরকার তাতে সম্মতি দিয়েছিল।

০২) ২১ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি আসামের ফরিদগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস, পাকিস্তানের বর্বরতা ও ২৩ বছরের শোষণের একটি চিত্র তুলে ধরেন। ২২ জানুয়ারি মেঘালয় থেকে তিনি ভারত সরকারের একটি জিপে বাংলাদেশের হালুয়াঘাটে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন চিকিৎসক ছিলেন। হালুয়াঘাটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এই জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীকে মামুলি অভ্যর্থনা জানান ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক খসরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও তাঁর ভক্তমণ্ডলী।

সড়কপথে ক্লান্তশ্রান্ত দেহে ২২ জানুয়ারি ১৯৭২-এর শেষ রাতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী পৌঁছান টাঙ্গাইলে। রাতে তিনি সার্কিট হাউসেই অবস্থান করেন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁর সন্তোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল। পরদিন অর্থাৎ ২৩ জানুয়ারি সকালে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ন্যাপসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে দেখতে সার্কিট হাউসে সমবেত হন। বহুদিন পর পরিচিত মানুষ ও সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় মজলুম জননেতা উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে একজনকে দিয়ে বললেন, ‘সন্দেশ নিয়ে এসো।’ ওই ১০ টাকার সঙ্গে আরও টাকা যোগ করে সন্দেশ আনা হলো। সবাইকে মিষ্টিমুখ করালেন তিনি।

দেখতে দেখতে অসংখ্য মানুষ জড়ো হলো—যেন এক ছোটখাটো জনসমাবেশ। ফুটপাতের এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নাতিদীর্ঘ, স্বভাবসুলভ ভাষণ দেন। বহুদিন পর টাঙ্গাইলবাসী শুনতে পায় তাদের পরিচিত কণ্ঠ। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে উপস্থিত জনতা। এরপর টাঙ্গাইল থেকে তিনি যান সন্তোষে নিজ বাড়িতে। তাঁর পোড়া ভিটেয় গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখেন, কোথায় কী ছিল তা শনাক্ত করেন। যেসব প্রিয় বস্তু খোয়া গেছে, সেগুলোর জন্য আক্ষেপ করেন। তাঁর গভীর অথচ চাপা দীর্ঘনিশ্বাস উপস্থিত শ্রোতাদের চোখ এড়ায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ :
“দলে দলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভক্তরা এসে পা ছুঁয়ে সালাম করতে লাগল তাদের প্রিয় হুজুর ও পীরবাবাকে। যেন মাটিরই পৃথিবীতে সদ্য এসেছেন পথভোলা এক মহামানব—মাটির মানুষের পরমাত্মীয়। এলাকার কে কোথায় মারা গেছেন, কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা কে কেমন আছে—সে খবর নিলেন তিনি। ঘনিষ্ঠ কারও কারও নিহত হওয়ার কথা শুনে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত ও কণ্ঠ বাকরুদ্ধ হয়ে ওঠে।”

০৩) মওলানা ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত তাঁরই স্বপ্নের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো দালানের একটি কক্ষে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ইতোমধ্যেই যথারীতি খিচুড়ি রান্না শুরু হয়ে গিয়েছিল সেখানে। কলাপাতায় যার যেমন খুশি খাচ্ছিল। সবার সঙ্গে মওলানা ভাসানীও খেলেন পরিতৃপ্তিসহকারে। শীতের ছোট দিন—তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে এলো, দর্শনার্থীদের ভিড় কিছুটা কমল। ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র—বিছানা, মলিন কাঁথা-বালিশ পর্যন্ত—ইয়াহিয়ার ফৌজ ভস্ম করে দিয়েছিল। সেদিন তীব্র শীত পড়েছিল। নেতার বিছানাপত্রের ব্যবস্থা করতে ভক্তরা পুরু করে নাড়া বিছিয়ে তার ওপর একটি চট দিয়ে শয্যা তৈরি করে দেন। আশপাশের কারও বাড়ি থেকে একটি জীর্ণ কাঁথা জোগাড় করা হয়। অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি সেদিন শুয়ে পড়েন মওলানা। স্বাধীন দেশে ফিরে এসে মাটির শয্যায় প্রথমবার স্বাধীনভাবে পরম শান্তিতে ঘুমান এ মাটির এক উঁচু মানব।

পরদিন অবশ্য তাঁর ভক্তরা একটি লেপ ও একটি তোষক তৈরি করে দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে সেদিন কি এটাই ছিল মওলানা ভাসানীর প্রাপ্য? অনেকের এই প্রশ্ন তাঁর বহু রাজনৈতিক বিরোধীকেও বিদ্ধ করে। অথচ ভারতে নজরবন্দি থাকা অবস্থায়ও ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁকে একজন মহান জাতীয় নেতার মর্যাদা দিয়েছিল। পক্ষান্তরে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সহকর্মী ও প্রিয়জনদের দ্বারা গঠিত সরকারের কাছ থেকে তিনি পেলেন যেন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী এক কোটি শরণার্থীর একজনের মতোই আচরণ।

প্রত্যাবর্তনের দুদিন পর স্বাধীন দেশে প্রথম সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশবাসীকে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ যতদিন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে এবং দেশের ও জনগণের কল্যাণে বাস্তব পদক্ষেপ নেবে, ততদিন আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অতীতের স্বৈরাচারী সরকারগুলোর মতো এ সরকারের পতনও অনিবার্য।”

০৪) স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, উপমহাদেশের মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এ অঞ্চলের সকল নির্যাতিত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক এবং পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান প্রবক্তা।

মজলুম জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। মওলানা ভাসানী আছেন এবং থাকবেন। যতদিন মেহনতি মানুষের সংগ্রাম চলবে, ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন। মওলানা ভাসানী ক্ষমতায় যাননি বটে, তবে তিনি ছিলেন ক্ষমতার পালাবদলের অনুঘটক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২–৭৫ পর্যন্ত অপশাসন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি।

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক। এ কারণেই ১৯৫৭ সালের কাগমাড়ি সম্মেলনেই তিনি পাকিস্তানিদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়েছিলেন, যার বাস্তব রূপ দেখা যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। ক্ষমতায় না গিয়েও কীভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণ করা যায়—মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন তার প্রমাণ। তাঁকে কেবল মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গেই তুলনা করা যায়। বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, তাঁতি-জেলে চিরকাল স্মরণ রাখবে তাদের এই আপন মানুষটির কথা, যাঁর গোটা জীবন ছিল তাদের মুক্তির জন্য উৎসর্গীকৃত।

০৫) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মওলানা ভাসানী যে ঐক্যের বাণী রেখে গেছেন, তা আজও আমাদের জন্য অবশ্যই স্মরণীয়। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখার দায়িত্বের কথা এবং বঞ্চিত জনগণকে দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে তুলে এনে সমৃদ্ধির আলোকবৃত্তে প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান।

পরিশেষে এভাবেই শেষ করতে চাই যে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে গঠিত সরকারগুলো তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় কোনো সরকারই এড়াতে পারে না। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারও তাঁকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ১৭ নভেম্বর ছিল মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী এবং ১২ ডিসেম্বর তাঁর জন্মবার্ষিকী। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দুই দিনের কোনো দিনেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কোনো বাণী চোখে পড়েনি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে মওলানা ভাসানীকে ব্যবহার করলেও প্রকৃত অর্থে তাঁকে তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। এর ব্যতিক্রম নয় নির্দলীয় বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারগুলোও। আজ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার আহ্বান জানিয়ে বলতে চাই—নিরপেক্ষ চিন্তায় তিনি অবশ্যই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা ভাসানীকে কেবল জাতীয় নেতার গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ রেখে, তাঁর চেয়ে কম অবদান রাখা নেতাদের উচ্চতর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার একপেশে আয়োজন সমগ্র জাতিকে হতবাক ও বিস্মিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, উপমহাদেশের অত্যাচারিত ও নির্যাতিত মেহনতি জনগণের নয়নমণি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ইতিহাস তাদেরও ক্ষমা করবে না।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরএন




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close