ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা
✎ সালাহ্উদ্দিন শুভ
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:০৩ পিএম
X

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খাবার চুঙ্গাপুড়া পিঠা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় শীত এলেই গ্রামীণ এলাকার বাড়িগুলোতে চুঙ্গাপুড়া পিঠার আয়োজন থাকলেও এখন আর সেই দৃশ্য তেমন দেখা যায় না। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারা রাত ধরে চুঙ্গাপুড়া পোড়ানোর যে চিরচেনা দৃশ্য ছিল, তা আজ স্মৃতির পাতায় বন্দী।

একসময় শীত মৌসুমে বাজারে মাছের মেলা বসত। মেলা থেকে মাছ কিনে কিংবা হাওর-নদী থেকে ধরা হতো রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ। সেই মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে (আঞ্চলিক ভাষায় মাছ বিরাণ) চুঙ্গাপুড়া পিঠা খাওয়া ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্য।

বাড়িতে মেহমান কিংবা নতুন জামাই এলে চুঙ্গাপুড়া পিঠা, মাছ বিরাণ ও নারিকেলের পিঠা পরিবেশন না করলে সামাজিকভাবে লজ্জার বিষয় বলে মনে করা হতো। তবে এখন আর সেই দিন নেই।

চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ হলো ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন ধানের চাল)। বর্তমানে এই দুই উপকরণের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক এলাকায় আগের মতো বিন্নি ধানের চাষও আর হয় না।

একসময় মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার উঁচু-নিচু টিলা, চা-বাগান এবং জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী এলাকায় প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। কিন্তু বনদস্যু, ভূমিদস্যু ও পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্যে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে ঢলু বাঁশ। বর্তমানে জেলার কিছু কিছু টিলায় সীমিত পরিমাণে ঢলু বাঁশ পাওয়া গেলেও সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এর দাম বেশ চড়া।

স্থানীয়রা জানান, ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরি করা যায় না। এই বাঁশে থাকা এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে বাঁশকে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। ঢলু বাঁশে অধিক রস থাকায় আগুনে না পুড়ে চুঙ্গার ভেতরের পিঠা তাপে সিদ্ধ হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে চুঙ্গার ভেতরে বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো চুঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই পিঠা পোড়াতে প্রচুর পরিমাণ খড় (নেরা) লাগে।

স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে সিলেট অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী খাবার ভবিষ্যতে শুধু স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজারে ঢলু বাঁশ বিক্রেতা নিধির ও নিপই শব্দকর বলেন, ‘আগে দিনে ১০–১৫ আঁটি বাঁশ পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা যেত। এখন ঢলু বাঁশ এতটাই কমে গেছে যে সারাদিনে ২ বা ৩ আঁটি বাঁশ সংগ্রহ করা যায়।’

তারা জানান, প্রতি পিস ঢলু বাঁশ ৫ টাকা করে বিক্রি হয়। মূলত পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এই ঢলু বাঁশ বিক্রি হয়।

পিঠা তৈরির জন্য কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা নিমাই মালাকার ও পিনু দেবনাথ বলেন, ‘সব সময় তো এই জিনিসগুলো পাওয়া যায় না। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে অল্প পরিমাণে বাজারে উঠেছে। ১০–১৫ বছর আগে প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। পরিবারের সদস্যরা পিঠা তৈরির কথা বলায় কয়েকটি বাজার ঘুরে শেষে মুন্সিবাজার থেকে অল্প কিছু ঢলু বাঁশ কিনেছি।’

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, ‘একটু সাহস করে চুঙ্গা খুলতে পারলেই ভেতরে লুকিয়ে থাকা মনোমুগ্ধকর স্বাদের পিঠা পাওয়া যায়। কিছুটা সময় অপেক্ষা করে পিঠা খাওয়ার মাঝেই এর আসল স্বাদ। চুঙ্গাপুড়া পিঠা সিলেটের পিঠে-পুলির অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু ঢলু বাঁশের সংকটে এই পিঠা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’

মৌলভীবাজারের লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, ‘আগে কমবেশি সবার বাড়িতে ঢলু বাঁশ ছিল। এখন সেই বাঁশ আগের মতো নেই। এই বাঁশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একসময় এই বাঁশ দিয়ে চুঙ্গাপুড়ার ধুম লেগেই থাকত।’

আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝