দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরে চলতি অর্থবছরের (২০২৫–২৬ অর্থবছর) প্রথম ছয় মাসে ২৮টি কন্টেইনার জাহাজসহ রেকর্ড ১৭ হাজার ৩৮৭টি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
সমুদ্রবন্দরটিতে গত ছয় মাসে রেকর্ড ৪৪০টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করেছে, যার ফলে বন্দরের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সময়কালে মোট ৫ হাজার ২৪৪টি আমদানিকৃত গাড়ি বহনকারী ১৫টি জাহাজ নোঙর করেছে। এ সময় ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭০ টন পণ্য আমদানি এবং ৪২ হাজার ৬৭১ টন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের (এমপিএ) ঊর্ধ্বতন উপ-ব্যবস্থাপক মো. মাকরুজ্জামান জানান, ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে বন্দরটি ২৬টি জাহাজের মাধ্যমে ১ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার ৬১১ টন আমদানিকৃত পণ্য এবং ৮৭ হাজার ৮০০ টন রপ্তানিকৃত পণ্য পরিচালনা করেছে। একই সময়ে ১১ হাজার ৫৭৯টি রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গত ছয় মাসে ৬৩ দশমিক ৭০ লাখ টনেরও বেশি পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট ১ দশমিক ০৪ কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছিল।
মাকরুজ্জামান বলেন, মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে রেকর্ডসংখ্যক জাহাজ নোঙর করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, খাদ্যশস্য, সিমেন্টের কাঁচামাল, ক্লিংকার, সার, অটোমোবাইল, যন্ত্রপাতি, চাল, গম, কয়লা, তেল, পাথর, ভুট্টা, তৈলবীজ ও এলপিজির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকে সহজতর করে জাতীয় চাহিদা পূরণে মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দর সাদা মাছ, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, কাঁকড়া, মাটির টাইলস, রেশম কাপড়সহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এমপিএ) ১০ দশমিক ৪১ মিলিয়ন টন পণ্যসম্ভার পরিচালনার মাধ্যমে ৩৪৩ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে একটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে।
এ সময় নিট মুনাফা হয়েছে ৬২ দশমিক ১ কোটি টাকা, যা এমপিএ নির্ধারিত ২০ দশমিক ৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।
এই অর্থবছরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর দিয়ে মোট ১১ হাজার ৫৭৯টি রিকন্ডিশনড যানবাহন আমদানি করা হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, মোংলা–ঘাসিয়াখালী রুটসহ একাধিক নদীপথে ড্রেজিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বৃহত্তর জাহাজগুলো এখন সরাসরি বন্দর জেটিতে ভিড়তে পারছে। এর ফলে নাব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং বন্দরে জাহাজ চলাচল আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্দরটি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো ভলিউম ও জাহাজ আগমন—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
নৌপরিবহন বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত বছর একাধিকবার বন্দর পরিদর্শন করেছেন এবং কার্যক্রমের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
আমদানিকৃত প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, সার, রিকন্ডিশনড যানবাহন, এলপিজি, স্ল্যাগ, চুনাপাথর, সয়াবিন তেল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, তাজা পণ্য, সাধারণ পণ্যসম্ভার, জিপসাম, যন্ত্রপাতি, কাঠ, কয়লা, পাথর, ক্লিংকার, পাম তেল, ফার্নেস তেল, উড়াল ছাই, লোহা, তেলবীজ, ইস্পাত পাইপ ও গুড়।
প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চিংড়ি, সাদা মাছ, শুকনো মাছ, কাদামাটি, কাঁকড়া, যন্ত্রপাতি, সুতির সুতা, হিমায়িত খাবার ও অন্যান্য সাধারণ পণ্য।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডোরসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
নৌযান আগমন বৃদ্ধি ও বাণিজ্য কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এমপিএ একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবসা উন্নয়ন স্থায়ী কমিটিও গঠন করেছে, যা ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফলাফল দিচ্ছে।
এসএস/আরএন