জমির মালিক তার জমি বিক্রি করতে চাইলে, প্রথমে অগ্রক্রয় অধিকারীদের বিক্রয়ের খবর জানাতে হবে। ওই জমির ওয়ারিশ সূত্রে যারা সহ অংশীদার, দ্বিতীয়ত ক্রয় সূত্রে যারা সহ অংশীদার এই দু’শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ অগ্রক্রয়ের অধিকারী। তারা আদালতে প্রি-এমপশন মোকদ্দমা দায়েরের মাধ্যমে পুনঃক্রয় করে নিতে পারবেন। যদি তারা ক্রয়ে আগ্রহী না হন তখন বিক্রেতা বাইরের ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করতে পারবেন।
এই মোকদ্দমা করতে কত টাকা কিভাবে আদালতে জমা দিয়ে মামলাটি করতে হয়, কোন শ্রেণীর জমির ক্ষেত্রে প্রিয়েমশন করা যাবে না, এ মামলাটি কত সময়ের মধ্যে করতে হয়, মামলাটি শেষ হতে কত সময় লাগে, জমি ক্রেতাকে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, মামলায় হেরে গেলে আপিলের বিধান কি-প্রিয়েমশন মামলার সার্বিক বিষয় নিয়ে আজকের এ নিবন্ধ।
কৃষি জমি ও অকৃষি উভয় প্রকারের জমির অগ্রক্রয় দাবি করে আদালতে মামলা করা যায়। মহানগরী এলাকা, পৌরসভা এলাকা, হাটবাজার ইত্যাদিকে অকৃষি জমি হিসেবে গণ্য করা হয়। কৃষি জমির অগ্রক্রয়ের ক্ষেত্রে State Acquisition Tenancy Act, ১৯৫০ এর ৯৬ ধারা এবং অকৃষি জমির অগ্রক্রয়ের ক্ষেত্রে Non Agricultural Tenancy Act, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারা মতে মামলা দায়ের করতে হয়।
State Acquisition Tenancy Act ১৯৫০ এর ৮৯ ধারা অনুযায়ী জমি রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৩ বছরের পর আর অগ্রক্রয় দাবি করে আর মামলা করা যাবে না। বিক্রিত জমির সাব কবলা দলিলে উল্লেখিত মূল্যমান অনুযায়ী আর্থিক এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে মামলা করতে হয়। মামলা দায়ের করতে হলে আদালতে চার ধরনের টাকা জমা দিতে হয় অন্যথায় মামলাটি আদালত খারিজ করে দিতে পারেন।
১। সাব কবলা দলিলে উল্লেখিত জমির মূল্য প্রদান করে।
২। উক্ত মূল্যের উপর বার্ষিক ২৫ শতাংশ হারে ক্ষতিপূরণ বাবদ।
৩। উক্ত মূল্যের বার্ষিক সরল সুদে ৮ শতাংশ হারে। মনে রাখবেন ২ এবং ৩ নং হিসাব করতে হবে দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে মামলা দায়েরের সময় পর্যন্ত।
৪। প্রথম ক্রেতা কর্তৃক উন্নয়ন বাবদ অন্যান্য টাকা যা পরবর্তীতে আদালত সমীচীন মনে করলে জমা দিতে নির্দেশ দেবেন।
আর মুসলিম আইনে তিন শ্রেণীর লোক অগ্রক্রয় দাবি করে মামলা করতে পারেন।
১। উত্তরাধিকার বা ক্রয় সূত্রে সহ অংশীদার।
২। যে জমির মধ্য দিয়ে বা সংলগ্ন পথ, পানির ড্রেন যাদের রয়েছে।
৩। সংলগ্ন জমির মালিক অর্থাৎ জমির পাশআলী বা প্রতিবেশী।
এ বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালত বলেছেন, অগ্রক্রয় মোকদ্দমায় সর্বপ্রথম উত্তরাধিকার সূত্রে শরীক তারপর খরিদা সূত্রে সর্বশেষ পাশ আইলার বিষয় বিবেচনা করা হয়। (৩০ ডিএলআর ৭৫)।
মনে রাখবেন মুসলিম আইনে হক সুফা মামলা করতে আগে টাকা জমা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। মামলার রায় হওয়ার পর টাকা জমা দিতে হয়। মুসলিম আইনের বিধানমতে প্রিয়েমশন মোকদ্দমায় মুসলিম সম্প্রদায় উপকার পেতে পারে। কিন্তু কোনো হিন্দু ক্রেতা মুসলিম আইনে প্রতিকার দাবী করতে পারে না। (৬৭ ডিএলআর ৩০২)
এবার জেনে নিই অগ্রক্রয়ের মামলা কখন করা যাবে না কিংবা মোকদ্দমাটি আইনত চলবে না। যদি-
১. বিক্রিত জমি বসতবাড়ি হয়।
২. অগ্রক্রয়ের মোকদ্দমা দায়ের করার আগেই বিক্রিত জমি যদি বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয় ৩. উক্ত বিক্রয় যোগসাজশী বা জাল বিবেচিত হয়।
৪. বিনিময় বা এ্যাওয়াজ বা ভাগ বাটোয়ারা সংক্রান্ত সম্পত্তি বিক্রি হলে।
৫. উইল বা দানমূলে বা হেবামূলে রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে জমি হস্তান্তর হলে।
৬. হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে জমি হস্তান্তর করলে।
৭. রক্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তিন পুরুষের কোনো দান বা উইল মূলে হস্তান্তর হলে।
৮. মুসলিম আইনে ওয়াক্ফ এবং ধর্মীয় কারণে বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত হস্তান্তর হলে- এমন ৮ কারণে জমি হস্তান্তর হলে উক্ত জমিতে আর প্রিয়েমশন করা যাবে না।
আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, আপনি জমি কিনেছেন কিন্তু অগ্রক্রয়ের অধিকারীরা প্রিয়েমশন করার পায়তারা করছে- এমন সময় আপনি জমিটি যদি স্ত্রী, সন্তানদের কারও মধ্যে হেবা করে দেন তাহলে ওই জমিতে আর প্রিয়েমশন মোকদ্দমা চলবে না। (৬ বিএলডি, ১২৫)
এছাড়া, অগ্রক্রয় মোকদ্দমা দাখিলের পূর্বেই নালিশী খতিয়ান পৃথক হয়ে থাকলে মামলাটি অচল হবে। (৩৯ ডিএলআর, ৭৫)।
মোকদ্দমায় আদালত বাদীর আবেদন মঞ্জুর করা হলো তার বরাবর ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেবেন। তবে এ রেজিস্ট্রেশনের জন্য কোনো কর, ডিউটি বা ফিস দিতে হবে না। ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে দিতে ব্যর্থ হলে এর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আদালত সাফ কবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেবেন। মনে রাখবেন এই আদেশের বিরুদ্ধে একবার আপিল করার সুযোগ আছে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
ইমেইল: seraj.pramanik@gmail.com
এমএ