ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে?
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:২০ পিএম
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, কঠিন হিসাব মেলাতে, লেখালেখি করতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে এখন অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্য নিচ্ছেন। এতে সময় ও শ্রম বাঁচছে। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান যদি এআই করে দেয়, তাহলে মানুষ নিজে চিন্তা করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষণায় মিলছে এ নিয়ে সতর্ক হওয়ার মতো কিছু ইঙ্গিত।

ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে একটি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে হবে। আগে তিনি বই ঘাঁটতেন, তথ্য খুঁজতেন, বিভিন্ন যুক্তি নিয়ে ভাবতেন। কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য—এসব বিচার করে নিজের মতো করে লেখা তৈরি করতেন। এখন একই কাজের জন্য কয়েকটি নির্দেশনা লিখে দিলেই এআই মুহূর্তের মধ্যে একটি গোছানো প্রবন্ধ তৈরি করে দিচ্ছে।

শুধু শিক্ষার্থী নন, চাকরিজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও প্রতিদিন নানা কাজে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। কেউ ই-মেইল লিখছেন, কেউ জটিল বিষয় বুঝছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত বা পেশাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চ্যাটবটের পরামর্শ চাইছেন।

এতে কাজ সহজ হচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাজ সহজ করতে গিয়ে মানুষ কি নিজের চিন্তা করার দায়িত্বও ধীরে ধীরে যন্ত্রের হাতে তুলে দিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে গবেষণাগুলো এটাও বলছে, এআই ব্যবহার করলেই মানুষের বুদ্ধি বা চিন্তাশক্তি কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং এআই কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

চিন্তার দায়িত্ব যখন যন্ত্রের হাতে

মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা রয়েছে, যার নাম ‘কগনিটিভ অফলোডিং’। সহজ ভাষায়, নিজের মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমাতে কোনো কাজের দায়িত্ব বাইরের কোনো উপকরণ বা প্রযুক্তির কাছে ছেড়ে দেওয়াকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

যেমন, আগে মানুষ ফোন নম্বর মুখস্থ রাখত। এখন মোবাইল ফোনে নম্বর সংরক্ষণ করে রাখে। ফলে নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন কমেছে। একইভাবে ক্যালকুলেটর ব্যবহারের কারণে অনেকেই ছোটখাটো হিসাব মাথায় করার বদলে যন্ত্রের সাহায্য নেন।

এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে এখানে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। কারণ, এআই শুধু তথ্য সংরক্ষণ বা হিসাব করে না; এটি যুক্তি সাজায়, বিশ্লেষণ করে, লেখে, তুলনা করে এবং সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে মতামতও দেয়।

ফলে ব্যবহারকারী চাইলে নিজের চিন্তার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারেন, আবার চাইলে পুরো কাজটিই এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রবণতিই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা।

গবেষণায় কী পাওয়া যাচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফট রিসার্চ ও কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৩১৯ জন জ্ঞানভিত্তিক কর্মী অংশ নেন। তাঁরা কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ৯৩৬টি বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের ওপর যাঁদের আস্থা বেশি, তাঁরা এআই-সহায়তায় কাজ করার সময় তুলনামূলকভাবে কম সমালোচনামূলক চিন্তা প্রয়োগ করেন। অন্যদিকে নিজের দক্ষতার ওপর যাঁদের আত্মবিশ্বাস বেশি, তাঁরা এআইয়ের উত্তর যাচাই ও বিশ্লেষণে বেশি মনোযোগ দেন।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, এআই ব্যবহারের ফলে মানুষের চিন্তার ধরন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না; বরং চিন্তার কাজের ধরন বদলে যায়। আগে মানুষ নিজে তথ্য খোঁজা ও বিশ্লেষণে বেশি সময় দিতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই, বিভিন্ন উত্তর একত্র করা এবং সেগুলো কাজে লাগানোর দিকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে। 

অর্থাৎ, এআই মানুষের চিন্তাকে একেবারে সরিয়ে দিচ্ছে এমন নয়। তবে এআইয়ের ওপর অন্ধ আস্থা তৈরি হলে নিজে যাচাই-বাছাই করার প্রবণতা কমতে পারে।

এআই কি চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মিডিয়া ল্যাবের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ‘ইয়োর ব্রেইন অন চ্যাটজিপিটি: অ্যাকিউমুলেশন অব কগনিটিভ ডেট হোয়েন ইউজিং অ্যান এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ফর এসে রাইটিং টাস্ক’ শীর্ষক গবেষণায় ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল শুধু এআই ব্যবহার করে, অন্য দল সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্য নিয়ে এবং তৃতীয় দল কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই প্রবন্ধ লেখে।

গবেষকেরা প্রবন্ধ লেখার সময় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (ইইজি) প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এতে দেখা যায়, নিজে চিন্তা করে লেখা দলের মস্তিষ্কে সবচেয়ে বিস্তৃত সংযোগ কার্যক্রম ছিল। সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল মাঝামাঝি। আর এআই ব্যবহারকারী দলের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, এআইয়ের সাহায্যে লেখা অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের লেখার প্রতি মালিকানাবোধ কম ছিল। এমনকি তাঁরা নিজেদের লেখা থেকে নির্ভুলভাবে উদ্ধৃতি দিতেও সমস্যায় পড়েছেন।

গবেষকেরা এ অবস্থাকে ‘কগনিটিভ ডেট’ বা চিন্তাগত ঋণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, তাৎক্ষণিক সুবিধার বিনিময়ে মানুষ নিজের চিন্তা ও শেখার প্রক্রিয়ায় যে ঘাটতি তৈরি করতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম এবং পরীক্ষাটি মূলত প্রবন্ধ লেখার মতো নির্দিষ্ট কাজের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই এর ফলাফল দিয়ে সব বয়সী মানুষের সামগ্রিক চিন্তাশক্তি কমে যাচ্ছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। গবেষণাটি এখনো আর্কাইভভিত্তিক প্রিপ্রিন্ট গবেষণা হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। 

উত্তর মনে থাকছে, কিন্তু শেখা হচ্ছে কি?

এআইয়ের ওপর নির্ভরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যেতে পারে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষেত্রে।

২০২৫ সালে সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় ১২০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর চ্যাটজিপিটির প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের একদল এআইয়ের সাহায্যে এবং অন্য দল প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়াশোনা করেন। শেখার প্রায় ৪৫ দিন পর তাঁদের অপ্রত্যাশিতভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, এআইয়ের সাহায্যে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা গড়ে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের সঠিক উত্তরের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, দ্বিতীয় দলের ফল ১১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

গবেষকদের মতে, এআইয়ের কাছ থেকে সরাসরি উত্তর পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিজেরা চিন্তা করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং বিষয়টি মনে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক পরিশ্রম কমে যেতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সহজে বুঝতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে শেখা তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি হতে পারে।

তবে এই গবেষণাটিও নির্দিষ্ট শিক্ষাবিষয় ও শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত। তাই এর ফলাফল সব ধরনের এআই ব্যবহার বা সব বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনটি বলা যায় না। 

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নির্ভরতার প্রবণতা

বিষয়টি শুধু বিদেশের গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

২০২৬ সালের ২৭ মে জার্নাল অব ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ ইন এডুকেশন-এ প্রকাশিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক বিজন কুমার রায় ও মো. সোলাইমান জনির একটি গবেষণায় ১২ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।

‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল থিংকিং ইন হায়ার এডুকেশন: স্টুডেন্টস ন্যারেটিভস অব কগনিটিভ অফলোডিং’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, এআই ব্যবহারের কারণে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়াশোনার বিষয়বস্তু গভীরভাবে বোঝার পরিবর্তে উপরিভাগের তথ্যের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি নিজেরা কতটা মানসিক পরিশ্রম করবেন, তা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও কমছে। কেউ কেউ ক্রমেই এআইয়ের চিন্তা ও বিশ্লেষণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

তবে গবেষণাটিতে মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। এটি মূলত তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিভিত্তিক গুণগত গবেষণা। ফলে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একই প্রবণতা রয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবু স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এআই নির্ভরতার সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। 

এআই কি তাহলে চিন্তাশক্তি বাড়াতেও পারে?

এতসব উদ্বেগের মধ্যেও এআইয়ের ইতিবাচক দিক উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্স-এ প্রকাশিত ২৯টি পরীক্ষামূলক ও আধা-পরীক্ষামূলক গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা বিকাশে জেনারেটিভ এআইয়ের মাঝারি মাত্রার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

গবেষণায় সমস্যা সমাধানের দক্ষতায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি দেখা গেছে। এরপর রয়েছে সমালোচনামূলক চিন্তা। তবে সৃজনশীল চিন্তার ক্ষেত্রে উন্নতির মাত্রা তুলনামূলক কম।

গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, এআই ব্যবহারের ফল নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছেন এবং নিজেদের শেখার প্রক্রিয়া কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তার ওপর। যাঁরা নিজেরা চিন্তা ও শেখার দায়িত্ব ধরে রেখে এআইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তাঁরা তুলনামূলক বেশি উপকৃত হয়েছেন। 

অর্থাৎ, এআই নিজে থেকেই কাউকে ভালো চিন্তাবিদ বা দুর্বল চিন্তাবিদ বানিয়ে দেয় না। বরং এটি ব্যবহারের পদ্ধতি মানুষের শেখার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় কী প্রভাব পড়ছে?

চিন্তাশক্তির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সম্পর্ক গভীর। কোনো পরিস্থিতি বিচার করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝা, বিভিন্ন বিকল্পের সুবিধা-অসুবিধা তুলনা করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য মানুষের নিজস্ব বিশ্লেষণী দক্ষতা প্রয়োজন।

এআই এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। যেমন, কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে এআইয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য বাজার, বিনিয়োগের ঝুঁকি ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে পারেন। একইভাবে চাকরি পরিবর্তন, উচ্চশিক্ষা কিংবা ভ্রমণের মতো বিষয়েও বিভিন্ন বিকল্পের তুলনা করা সম্ভব।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন ব্যবহারকারী এআইয়ের বিশ্লেষণকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করেন।

কারণ, এআইয়ের উত্তর সব সময় নির্ভুল হয় না। অনেক সময় এটি ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। আবার কোনো বিষয়ে ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য অসম্পূর্ণ হলে বিশ্লেষণও ভুল হতে পারে। ফলে নিজের পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বিবেচনা না করে এআইয়ের পরামর্শ অনুসরণ করলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এআই সাধারণত প্রশ্নের ভিত্তিতে উত্তর তৈরি করে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, পারিবারিক বাস্তবতা, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব সময় পূর্ণাঙ্গভাবে বিবেচনা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তাই এআইয়ের দেওয়া সম্ভাব্য সমাধানকে নিজের বিচার-বিশ্লেষণের বিকল্প না বানিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত।

এআই ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং এর ব্যবহার এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের নিজস্ব চিন্তা করার অভ্যাসও বজায় থাকে।

এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা ধরে রাখতে হলে প্রথমেই কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে এআইয়ের সাহায্য নেওয়ার আগে নিজে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। কোনো বিষয় না বুঝলে সরাসরি উত্তর না চেয়ে এআইয়ের কাছে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা চাইতে হবে, যাতে শেখার সুযোগ তৈরি হয়। 

পাশাপাশি এআইয়ের দেওয়া তথ্য নির্ভরযোগ্য বই, গবেষণা, সরকারি ওয়েবসাইট ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা জরুরি। এআইয়ের পরামর্শ ও সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনায় নিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী। একই সঙ্গে বই পড়া, হাতে লেখা, নিজে হিসাব করা, বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক করা এবং নতুন সমস্যার সমাধান খোঁজার মতো প্রযুক্তিনির্ভর নয়, এমন কাজের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। এতে স্বাধীন চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বজায় থাকবে।

এআই নয়, নির্ভরতার ধরনই মূল বিষয়

এআই মানুষের চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বজনীন গবেষণা এখনো পর্যাপ্ত নয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি বিষয়ে সতর্ক করছে—নিজের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও শেখার দায়িত্ব পুরোপুরি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিলে মানুষের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দক্ষতার চর্চা কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে, এআইকে তথ্য সংগ্রহ, নতুন ধারণা তৈরি, জটিল বিষয় বোঝা এবং নিজের যুক্তি যাচাইয়ের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করলে তা চিন্তাশক্তি বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তির ইতিহাসে ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ও সার্চ ইঞ্জিন মানুষের কাজের ধরন বদলে দিয়েছে। এআইও সেই পরিবর্তনের আরও শক্তিশালী একটি ধাপ। তবে কোনো প্রযুক্তি মানুষের হয়ে কাজ করতে পারে বলেই মানুষের নিজের কাজ করার সক্ষমতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না।

বরং এআইয়ের যুগে নিজে চিন্তা করা, প্রশ্ন তোলা, তথ্য যাচাই করা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সুতরাং, প্রশ্নটি এআই ব্যবহার করা উচিত কি না, তা নয়। বরং এআই ব্যবহারের পরও মানুষ নিজে কতটা চিন্তা করছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রকে চিন্তার সহকারী বানানো আর চিন্তার দায়িত্ব যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

এসএস
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝