বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক বহুল আলোচিত ও ঘটনাবহুল দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তন। সেই ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দলটির কাছে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস- যা জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ঐক্যের প্রতীক।
দিনটি ঘিরে এবারও ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে দলটি। কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র্যালি।
সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়াউর রহমান
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। সে সময় দেশে চলছিল চরম রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা। সিপাহী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অঙ্গনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে।
মুক্তিযুদ্ধের ময়দান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেওয়া হয় ‘বীর উত্তম’ খেতাব।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনশক্তি রপ্তানি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি সে সময়ের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে আলোচিত হয়।
বিএনপির জন্ম, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিস্তার
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে আসেন। পরবর্তী কয়েক দশকে সরকার ও বিরোধী দল—দুই ভূমিকাতেই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে বিএনপি।
দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো বিএনপির সাংগঠনিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৭ নভেম্বর ঘিরে বিএনপির সাত দিনের আয়োজন
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ২০২৬ সালে ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।
দলীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১১টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। এ সময় ফাতেহা পাঠেরও কর্মসূচি রয়েছে।
দিনটির অন্যতম প্রধান আয়োজন বিকেল ৩টায়। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৮ নভেম্বর থানা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। সাত দিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।
স্মৃতিচারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তুলে ধরার আয়োজন
বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বর শুধু অতীতের একটি ঘটনাকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস তুলে ধরারও উপলক্ষ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা, রাষ্ট্র পরিচালনায় নেওয়া উদ্যোগ এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে তাঁর যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, দিবসটি ঘিরে তা নতুন করে সামনে আনতে চায় দলটি।
অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এবং জিয়াউর রহমানের শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অঙ্গনে রয়েছে নানা মত ও বিতর্ক। ফলে দিনটির তাৎপর্য অনুধাবনে প্রয়োজন ইতিহাসের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন।
সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংগঠনিক ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি দিন। সাত দিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এবারও দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তুলে ধরতে চায় দলটি।