পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়ন ও জনবল দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগে দেশের সাতটি শিল্প গ্রুপের প্রায় ২২৫টি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব আপাতত জব্দ না করে সেগুলোর লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সংস্থাটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) দেশের সব ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়েছে। নির্দেশনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য, লেনদেনের বিবরণ এবং আর্থিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, তাঁদের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা তৈরি না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আপাতত প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব জব্দ না করে লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এনবিআরের তালিকায় রয়েছে এনভয়, মন্ডল, গিভেন্সি, স্ট্যান্ডার্ড, নিপা, ওয়েল ও তুসুকা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম। এসব শিল্প গ্রুপের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।
তালিকায় এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। মন্ডল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোমিন মন্ডলসহ গ্রুপটির ৪৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরি, ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুচ সালাম এবং তুসুকা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমানের নামও রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার নামও তালিকায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সাত শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, সাতটি শিল্প গ্রুপের প্রায় ২২৫টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে ঘিরে আর্থিক অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে সাত শিল্প গ্রুপের ১২০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
তদন্তের আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক লেনদেন, অর্থের উৎস, অর্থ স্থানান্তর এবং সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তালিকাটি প্রতিদিন হালনাগাদ করা হচ্ছে। ফলে অনুসন্ধানের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।
এনভয় গ্রুপ: আবদুস সালাম মুর্শেদি ও পরিবারের সদস্যদের নাম
এনবিআরের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও পাঁচ ব্যক্তির নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এনভয় গার্মেন্টস লিমিটেড, এনভয় প্যাকেজেস লিমিটেড, এনভয় ডিজাইন লিমিটেড, এনভয় ফ্যাশনস লিমিটেড এবং এনভয় টেকনোলজিস লিমিটেড।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদি, তাঁর স্ত্রী শারমিন সালাম, মেয়ে শাহরিন সালাম ওশী এবং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট রাশিদা আহমেদ ও তানভীর আহমেদ।
আবদুস সালাম মুর্শেদি দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের একজন পরিচিত উদ্যোক্তা। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এনবিআরের অনুসন্ধানে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্ডল গ্রুপ: ৪৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম
সাতটি শিল্প গ্রুপের মধ্যে মন্ডল গ্রুপের সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। গ্রুপটির মোট ৪৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।
তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—মন্ডল ইন্টিমেটস লিমিটেড, কটন ফিল্ড (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লোথিং (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল ফেব্রিকস লিমিটেড, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড, মার্ক সোয়েটার লিমিটেড, মন ট্রিমস লিমিটেড, মন্ডল স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মন্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং লিমিটেড (পূর্বের নাম মন্ডল অটো ব্রিকস লিমিটেড), আলিম নিট (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, অ্যাপোলো ফ্যাশন লিমিটেড, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড, ইকো ইন্টিমেটস লিমিটেড, নূর চেকস অ্যান্ড স্ট্রাইপস লিমিটেড, অ্যাপোলো নিটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড, অ্যাপোলো প্যাকেজিং (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাউট (বিডি) লিমিটেড, নিটেক্স ড্রেসেস লিমিটেড, এমব্রেলা লিমিটেড, মন্ডল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, মন্ডল নিট কম্পোজিট লিমিটেড, মন্ডল নিটওয়্যারস লিমিটেড, মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, মনটেক্স ফেব্রিক্স লিমিটেড, পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং জিগজ্যাগ স্টুডিও (বিডি) লিমিটেড।
এ ছাড়া তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, মোসা. সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আব্দুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আব্দুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, সুরাভী রহমান, শেরিন সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার ও হাজী আব্দুল মজিদ মন্ডল।
মন্ডল গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন মন্ডল। তাঁর নামও এনবিআরের অনুসন্ধানের তালিকায় রয়েছে।
গিভেন্সি গ্রুপ: চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তালিকায়
গিভেন্সি গ্রুপের নয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে এনবিআরের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গিভেন্সি গার্মেন্টস লিমিটেড, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস লিমিটেড, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড এবং গিভেন্সি ফুডস অ্যান্ড অ্যাসেনশিয়ালস লিমিটেড।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন লিপা, মাহমুদা খাতুন এবং খতিব আব্দুল হাদী। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পরিচালনার সঙ্গে মাসুমা খাতুন লিপাও যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ: ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে এনবিআরের অনুসন্ধানের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড-সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ (জেভি)।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়াহ রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ এবং হাসিব মোশাররফ।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম পরিচিত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। গ্রুপটির প্রধান কর্ণধার এ কে এম মোশাররফ হুসাইন। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিপা গ্রুপ: ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে এনবিআর
নিপা গ্রুপের ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে অনুসন্ধানের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নিপা নিট ওয়ার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং নিপা ফ্যাশন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সানজিদ চৌধুরি, খসরু চৌধুরি, এম মুনিরুল ইসলাম এবং মো. টিপু সুলতান।
খসরু চৌধুরি নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। তাঁর নামও এনবিআরের অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
ওয়েল গ্রুপ: চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপের ১৫ নাম
চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের ১৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে এনবিআরের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়েল অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, ওয়েল গ্রুপ, ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড এবং ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড।
গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন নাসরিন আক্তার, আবদুস সালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তরিকুল ইসলাম, মো. আসিফ হাসান, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম, নাসরিন আফরোজ, আকতারুনিসা এবং জিনাত ইসলাম।
ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম। তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নামও এনবিআরের অনুসন্ধানের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তুসুকা গ্রুপ: ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম
তুসুকা গ্রুপের ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এনবিআরের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো তুসুকা প্যাকেজিং লিমিটেড, তুসুকা স্টিচেস লিমিটেড, তুসুকা অ্যাপারেলস লিমিটেড, তুসুকা ফ্যাশনস লিমিটেড, তুসুকা ওয়াশিং লিমিটেড, তুসুকা প্রসেসিং লিমিটেড, তুসুকা ডেনিম লিমিটেড, তুসুকা জিন্স লিমিটেড এবং তুসুকা ট্রাউজার্স লিমিটেড।
এ গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান, ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, একরামুল হক, মো. আতিকুজ্জামান (সাগর) এবং মো. আতিকুজ্জামান (রিপন)।
তুসুকা গ্রুপের এসব প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অর্থের উৎস এবং লেনদেনের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইছে এনবিআর।
সাত শিল্প গ্রুপের বাইরেও কয়েকজন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বের নাম এনবিআরের অনুসন্ধান ও ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান এবং মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা।
এস এম আবদুল মান্নানের পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানসহ আরও কয়েকজনের নামও তালিকায় রয়েছে। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মিরপুর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে ইলিয়াস মোল্লার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এনবিআরের আরও কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় নতুন করে আরও ব্যক্তির নাম যুক্ত হতে পারে। তালিকায় থাকা ব্যক্তির সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা অন্য সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগেই জব্দ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এর আগে ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ
এর আগে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানিয়েছিলেন, বিশেষ কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি এবং ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান অনুসন্ধান সেই কার্যক্রমেরই একটি বিস্তৃত অংশ। নতুন করে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিদিনই তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে। এ কারণে এখনই চূড়ান্ত সংখ্যা বা সব নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ শেষে পূর্ণাঙ্গ বিষয়টি জানানো হবে।
এদিকে পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের এই বক্তব্যের পর পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়ন ও জনবল সরবরাহের অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখার বিষয়টি সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো জানা যায়নি।
কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন পোশাকশিল্প এলাকায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই এ আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত। এ খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, উদ্যোক্তা, সরবরাহকারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যুক্ত। ফলে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করছে এনবিআর। তবে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব একযোগে জব্দ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য যাচাই, ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
আরএন