যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের লাগামহীন প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। এক দিনের ব্যবধানে আমেরিকান শীর্ষ শেয়ারবাজার ওয়াল স্ট্রিটে তালিকাভুক্ত বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্য কমে বাজার থেকে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন (আড়াই লাখ কোটি) ডলার উধাও হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট। একই সঙ্গে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোন্স সূচকেও বড় পতন হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, ওয়াল স্ট্রিটের এই ভয়াবহ দরপতনের ধাক্কা শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে লেনদেন শুরুর পরপরই ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। দক্ষিণ কোরিয়ার বেঞ্চমার্ক ‘কোস্পি সূচক’ এক লাফেই প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে সেখানে ২০ মিনিটের জন্য সব ধরনের লেনদেন স্থগিত করা হয়।
বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি-নির্ভর ওয়াল স্ট্রিটের ‘নাসডাক’ সূচক ৫.৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সূচকটি গত ৬ অক্টোবরের সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে বর্তমানে ১০ শতাংশের বেশি নিচে নেমে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘটনার পর এটিই ছিল নাসডাকের সবচেয়ে খারাপ দিন। এ ছাড়া ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’ সূচক ৪.৪ শতাংশ এবং ‘ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ’ এক দিনেই ১ হাজার ৮৩৩ পয়েন্ট বা ২.৮ শতাংশ পড়ে গিয়ে আগের সব লাভ ধুয়েমুছে গেছে।
ওয়াল স্ট্রিটে এই স্মরণকালের বড় দরপতনের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজাসার নিরঙ্কুশ বিজয়। টেক্সাস বর্তমানে মার্কিন এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারের মূল কেন্দ্রস্থল; যেখানে গুগল, মেটা, ওরাকল এবং ওপেনএআই-এর মতো টেক জায়ান্টগুলো হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। নতুন গভর্নর জিনা হিনোজোসা তার নির্বাচনী প্রচারণায় রাজ্যে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কর ছাড়ের মতো প্রণোদনাগুলো বাতিলের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
রাজনীতির এই নতুন মোড়ের প্রভাবে বৃহস্পতিবার মার্কিন চিপ নির্মাতা ও এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল শীর্ষ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির প্রধান চিপ সরবরাহকারী এনভিডিয়ার শেয়ার এক দিনেই ৯.৩ শতাংশ কমে গেছে। ফলে চলতি বছরের সব আর্থিক মুনাফা খোয়া গেল। চিপ নির্মাতাদের সমন্বিত সূচক ১২.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতনের রেকর্ড।
ইলন মাস্কের টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ার যথাক্রমে ১১ শতাংশ এবং ৯ শতাং কমেছে। এআই প্রক্রিয়াকরণে কম্পিউটিং পাওয়ার ভাড়া দেওয়া নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠান ‘কোরওয়েভ’ এবং ‘নেবিয়াস’-এর শেয়ারের পতন হয়েছে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ। ওয়াল স্ট্রিটের ‘ভয়ের সূচক’ হিসেবে পরিচিত ভিআইএক্স এক দিনে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বিগত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বিনিয়োগ হিসেবে ট্রেজারি বন্ড কেনার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড কমে ৪.৮৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
দ্য ন্যাশনাল নিউজ জানিয়েছে, ওয়াল স্ট্রিটে দরপতনের ধাক্কায় এশিয়ার শেয়ারবাজারেও শুক্রবার লেনদেনে অস্থিরতা দেখা গেছে। দিনের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৯২৩ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে নেমে আসে। এতে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০ মিনিটের জন্য শেয়ার লেনদেন স্থগিত করে। চলতি বছরে এ নিয়ে দশমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে সার্কিট ব্রেকার চালু করা হলো।
কোসপি সূচকটি গত নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অক্টোবরের শেষ দিকে ছুঁয়ে যাওয়া সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচকটির পতন ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুনে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকে সূচকটি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে।
দরপতনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ার। স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ারের দাম কমেছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মেমোরি চিপ সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এই দুটি কোম্পানি। চলতি বছর কোসপি সূচকের ঊর্ধ্বগতিতেও তাদের বড় ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে বেয়ার মার্কেটে প্রবেশ করেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক কমেছে ১ শতাংশ। চীনের মূল ভূখণ্ডের সিএসআই ৩০০ সূচক কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ভিয়েতনামেও শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা গেছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দেশটির ভিএন-ইনডেক্স ১৪ পয়েন্টের বেশি কমে ১ হাজার ৭২৬ পয়েন্টে নেমে আসে।
বাজার বিশ্লেষকেরা অবশ্য একে দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে দেখার চেয়ে হঠাৎ উদ্ভূত প্যানিক রিয়্যাকশন হিসেবেই দেখছেন। ইয়ার্ডেনি রিসার্চের প্রেসিডেন্ট এড ইয়ার্ডেনি পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, ‘আমরা মূলত এআই নির্মাণের বেপরোয়া ও অনুমাননির্ভর গতি একটু কমাতে চাই। পুরো এআই বাবল ফেটে যাওয়ার চেয়ে সেটির কিছুটা বাতাস বের হতে দেওয়া সার্বিক অর্থনীতির জন্য শ্রেয়।’