যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান বদলাতে শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের ইরানবিরোধী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ যুদ্ধের সময়কাল ও পরিণতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ।
প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে তা বলেছেন।’
২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত ছিল।
তিনি লেখেন, ‘কেউ যদি মনে করেন, এর বিনিময়ে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো সার্থক ছিল, তাহলে সে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন।’
অন্যদিকে, ইরানবিষয়ক যুদ্ধের দীর্ঘদিনের সমর্থক সিনেটর টেড ক্রুজ বুধবার নিজের পডকাস্টে বলেন, যুদ্ধটি ‘স্বল্পস্থায়ী, চূড়ান্ত এবং শেষ হয়ে যাওয়ার মতো’ হওয়া উচিত ছিল।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধ ‘অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হয়েছে’। তবে ইরানকে কোনোভাবেই ‘কয়েকশ কোটি ডলার’ দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ক্রুজের এ মন্তব্যের ইঙ্গিত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের দিকে। এতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলসহ কয়েকটি বিষয় আলোচনার জন্য রাখা হয়েছিল। প্রস্তাবটি নিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা হয়। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ইরান সরকারকে বিপুল অর্থ দেওয়া হবে। তবে যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা ওই সমঝোতা দ্রুত ভেঙে পড়ে।
ট্রাম্প অবশ্য ইরানে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত নন। চলতি সপ্তাহে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, ‘আমি সঠিক কাজ করেছি। আবারও একই কাজ করতাম।’
বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ভ্যান্সের মূল্যায়ন ‘অনেকাংশে সত্য’। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটাররা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল বলে তিনি দাবি করেন।
কেন দূরত্ব তৈরি করছেন ট্রাম্পের মিত্ররা
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান নেতারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সরকারবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে।
তার মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এ পর্যন্ত যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের আনুমানিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহীদের যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
তবে ক্রুজের মতো কট্টর ইরানবিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। এখন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই ক্ষেত্রেই তা তাদের জন্য বিপর্যয়কর হয়েছে বলে মনে করেন মাসগ্রেভ। তার ভাষায়, তারা যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে পারছেন না; বরং যুদ্ধের সময়কাল ও পরিচালনা নিয়ে সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছেন।
অন্যদিকে, ভ্যান্স রিপাবলিকান পার্টির তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর বড় অংশের সমর্থন পেতে তিনি যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন বলে মনে করেন মাসগ্রেভ।
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেড বলেন, ভ্যান্স শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। অথচ তাকে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে। এখন ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতপার্থক্য প্রকাশ পাচ্ছে।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কর্মকর্তা জন ফিহেরিও বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ বড় কারণ ছিল। পাশাপাশি জ্বালানির দাম, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্নীতিও ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভ্যান্স ও ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নাম সামনে আসছে।
যুদ্ধ বন্ধে কী করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থায়ন সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বুধবার বলেন, ‘এই যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’ তিনি জানান, যুদ্ধের অর্থায়নের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে শুমার বলেন, প্রতিষ্ঠাতারা কংগ্রেসের হাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যাতে মার্কিন জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করলে তা ঠেকানো যায়।
কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যেকোনো যুদ্ধ কার্যক্রমে অর্থায়ন বন্ধে একটি প্রস্তাব আনার কথা বলেছেন। তার মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই এ যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত।
মাসগ্রেভের মতে, যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা বাজেটের অর্থ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। এ ছাড়া কংগ্রেসের শুনানি ও তদন্তের মাধ্যমে যুদ্ধকে অজনপ্রিয় করে তোলা এবং এর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে ফেলা সম্ভব।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সমালোচনার মুখে রয়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সিবিএস নিউজকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধে ভূমিকার জন্য হেগসেথকে ‘জবাবদিহির মুখে’ পড়তে হবে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো তাকে ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে মাসগ্রেভ সতর্ক করে বলেন, কংগ্রেসের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সীমা মানতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনীহা নিয়ে আরও বড় বিরোধ তৈরি হতে পারে। তার মতে, যুদ্ধক্ষমতা আইন নিয়ে বিরোধের চেয়েও এ বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কি এখনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে
হ্যাঁ। কূটনৈতিক তৎপরতা এবং কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জুনের পর ওই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হামলাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে বর্ণনা করেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, বুধবার থেকেই শুরু হতে পারে, এমন হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। ওই সময় তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরিও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে থাকার কথা।
গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরো বলেন, ট্রাম্প সবাইকে এমনকি ইরানকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ায় ট্রাম্পের মনে হতে পারে, তার হারানোর কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করতে পারেন।
তবে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটরা ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন না। কাফিয়েরোর মতে, ট্রাম্প এ সময়কে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন। যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ইতোমধ্যে করেছে তেহরান।
এর পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের শর্তের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অবস্থানকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মন্তব্য করেছে তেহরান।
কাফিয়েরো বলেন, দুই পক্ষ মূল ইস্যুগুলোতে সমঝোতায় রাজি হলেই কাতারের মধ্যস্থতা সফল হতে পারে। তবে ইসরায়েল সম্ভাব্য যেকোনো কূটনৈতিক সমঝোতা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের রাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, আপাতত নতুন করে হামলার নির্দেশ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই।