তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে এক মাসের মধ্যে সুপারিশ প্রণয়নের আশা প্রকাশ করেছে নবগঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড। একই সঙ্গে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান বোর্ডের চেয়ারম্যান জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানী।
তিনি বলেন, আগেরবারের মতো দীর্ঘ সময় নিয়ে এবার মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে না বলে তাঁরা আশা করছেন। শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ে নতুন মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করা হবে।
সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে শুরু হওয়া সভায় মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় সদস্যদের পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি মজুরি নির্ধারণের আইনগত প্রক্রিয়া, কর্মপদ্ধতি এবং পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
চেয়ারম্যান জানান, গত ১ নভেম্বর সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেছেন। পরবর্তী সভায় প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব ও সুপারিশ নেওয়া হবে। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে অগ্রসর হবে বোর্ড।
আগেরবার মজুরি নির্ধারণে সাতটি সভা করতে হয়েছিল। এবার কতটি সভা প্রয়োজন হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত এ ধরনের কাজের জন্য ছয় মাসের সময়সীমা থাকে। তবে বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে বোর্ড গঠন করেছে। তাই এবার আগের মতো দীর্ঘ সময় লাগবে না বলে তাঁরা আশাবাদী।
শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বোর্ডের কর্মপরিকল্পনা ও কার্যপদ্ধতি শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষেই রয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরাও সভায় শ্রমিকদের বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাই শ্রমিকদের বোর্ডের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমিকদের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার নিশ্চয়তা দেননি। তবে দ্রুত ইতিবাচক ফল পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শ্রমিকদের মজুরি প্রস্তাব এবং মালিকপক্ষের মতামত পাওয়ার পর বোর্ড পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেবে বলে জানান তিনি।
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের অন্যতম দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু সর্বনিম্ন মজুরির অঙ্ক নয়, বিভিন্ন গ্রেডের বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব বিষয়ে বোর্ডের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বোর্ডের পরবর্তী সভা আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। এর আগে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা নিজ নিজ সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব তৈরি করবেন।
তিনি বলেন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভালো ফল নাও আসতে পারে। তাই দ্বিতীয় সভার আগে উভয় পক্ষকে প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে আলোচনার একটি আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি হয়েছে। তবে শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।
মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান লক্ষ্য। নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে বোর্ডের সুপারিশ এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও মালিকেরা।
এফএস