প্রতি বছরের মতো এবারও দুবলার চরে শুঁটকি তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৩০ অক্টোবর থেকে পূর্ব সুন্দরবনের পাঁচটি চরে মাছ আহরণ শুরু করেছেন উপকূলের প্রায় ১০ হাজার জেলে। এর আগে ২৯ অক্টোবর বন বিভাগ জেলেদের সমুদ্রযাত্রা ও মাছ আহরণের জন্য পাস-পারমিট দেওয়া শুরু করে। এরপর মোংলা নদী থেকে শুঁটকিপল্লির উদ্দেশে রওনা হন দেশের বিভিন্ন এলাকার জেলে ও মহাজনেরা। তবে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যের শুরুতেই এবারও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দস্যু আতঙ্ক, খারাপ আবহাওয়া ও পাহাড়সম ঋণের বোঝা।
গত শুঁটকি মৌসুমে বনদস্যুদের চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক মাছ ও শুঁটকি ব্যবসায়ী। মাছ ধরতে না পারা এবং দফায় দফায় চাঁদা দেওয়ায় বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারেননি তাঁরা। ফলে আগের ঋণ শোধ করতে না পেরে অনেকেই এবার নতুন করে চড়া সুদে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের জন্য দুবলার চরে যাচ্ছেন। আবার অর্থসংকটের কারণে কেউ কেউ এবার সেখানে যেতে পারছেন না।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জেলে বহদ্দার আলামিন জানান, গত মৌসুমে তাঁকে বনদস্যুদের তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। তাঁর ১৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে এবং সমপরিমাণ আগের ঋণ রয়েছে। এবার বাধ্য হয়ে তিনি নতুন করে ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আবারও দুবলায় ব্যবসা শুরু করেছেন।
জেলে-মহাজন শাহজাহান মনা জানান, গত বছর তিনি দস্যুদের আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। তাঁর লোকসান হয়েছে ১০ লাখ টাকা এবং আগের ঋণ রয়েছে আরও ১০ লাখ টাকা। এবার তিনি নতুন করে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আবারও ব্যবসা শুরু করছেন।
দুবলার চরে শুঁটকি তৈরির জন্য মাছ আহরণে যাওয়ার সময় মোংলা নদীতে কথা হয় জেলে কবির শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন সাগরের শান্তি উঠে গেছে। দস্যুতা বন্ধ না হলে জেলে বা মহাজন—কেউই লাভের মুখ দেখবেন না।’ তিনি জানান, একসময় পাঁচ মাস আয় করে সারা বছর সংসার চালাতেন তাঁরা। এখন নামমাত্র আয় নিয়ে ফিরতে হয়। কখনো আবার খালি হাতেও ফিরতে হয়। দস্যুরা অপহরণ করলে তাঁদের জিম্মি থাকতে হয়। মহাজন ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন, নতুবা পরিবারের সদস্যরা ধার বা সুদে টাকা নিয়ে দস্যুদের কাছ থেকে তাঁদের ছাড়িয়ে আনেন।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন বিভাগ এবার জেলেদের থাকার জন্য ৯০০টি ঘর, মাছ কেনাবেচার জন্য ১০০টি ডিপো এবং মুদি দোকান, ওষুধের দোকান ও হোটেলসহ ১০০টি অস্থায়ী দোকানের অনুমোদন দিয়েছে। জেলেরা মূলত দুবলার আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে অবস্থান করবেন। বনের কোনো ধরনের গাছপালা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় জেলেরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য সঙ্গে বাঁশ, বেড়া ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে গেছেন।
তিনি জানান, খারাপ আবহাওয়া ও দস্যুদের কারণে গত মৌসুমে আট কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল ৫ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন। ওই মৌসুমে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে আট কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দস্যুতা না কমলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে বলে জানান তিনি।
জেলেদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবার প্রথমবারের মতো ‘ফ্রেন্ডশিপ’ সংস্থার একটি ভাসমান হাসপাতাল ও একটি স্পিডবোট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, মৎস্যজীবীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। দুবলার চর, আলোরকোল, কটকা ও আশপাশের নদী ও চ্যানেলে কোস্ট গার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকবে। দস্যুতা রোধ ও নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ড সর্বদা সজাগ রয়েছে। যেকোনো সমস্যায় দ্রুত সহায়তার জন্য তিনি জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের আহ্বান জানান।