ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
৩০ অক্টোবর শুরু শুঁটকি মৌসুম, সংকট উপেক্ষা করে সাগরে ছুটছেন জেলেরা
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:০১ পিএম আপডেট: ২৮.১০.২০২৬ ৯:৩৫ পিএম
X
Advertisement

পেছনে মহাজনের ঋণ, সামনে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে ভারতীয় জেলেদের আধিক্যসহ নানা সংকট মাথায় নিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণে নামছেন হাজার হাজার জেলে।

আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকি মৌসুম। এ উপলক্ষে পাঁচ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও সরঞ্জাম মজুত করে প্রস্তুতি শেষ করেছেন জেলেরা। এদিকে, চলতি মৌসুমে শুঁটকি পল্লী থেকে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ।

মৌসুম সামনে রেখে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, মাহামুদকাঠি, হেতামপুর, রামনাথপুর ও কাঠিপাড়াসহ বিভিন্ন জেলে পল্লীতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আজ-কালের মধ্যেই জেলেরা নৌকার বহর নিয়ে দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হবেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে টানা পাঁচ মাস সাগর ও ডাঙায় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাঁদের।

পাইকগাছার বোয়ালিয়া গ্রামের বিশ্বাস শঙ্করসহ ৪০ জন জেলে পাঁচটি নৌকার বহর নিয়ে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ মহাজনের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নৌকা, সরঞ্জাম ও খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সাগরে ভারতীয় জেলেদের আধিক্য এবং বনদস্যুদের তৎপরতা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।

জেলে বরাম সরদার বলেন, এবারের মৌসুমে সাগরে তেমন ইলিশ পাওয়া যায়নি। ভারতীয় জেলেদের কারণে গভীর সমুদ্রেও যেতে পারেননি তাঁরা। ফলে নতুন মৌসুমে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বনদস্যুদের চাঁদাবাজির চাপ। বেশি মাছ ধরা পড়লে তার একটি অংশ দস্যুদের দিতে হয় বলে জানান তিনি।

জেলেদের অভিযোগ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের মৎস্য খাতে অবদান রাখলেও তাঁদের জীবনযাত্রার তেমন উন্নতি হয়নি। জলদস্যুদের তৎপরতা, ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাঁদের জীবিকা আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তবে গত তিন থেকে চার বছর ধরে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে লাইফ জ্যাকেট, রেডিও, জিপিআরএস, বয়া ও কম্পাস ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায় কিছুটা সুরক্ষা মিলছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

রামনাথপুর গ্রামের আশুতোষ বিশ্বাস (৫৫) প্রায় ৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ আহরণ করছেন। এবারও শুঁটকি মৌসুমে সাগরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আশুতোষ বলেন, দিন দিন সাগরে মাছ কমছে। আগে ছুরি, ভেটকি, লইট্টা, চিংড়ি, কাঁকড়া, রূপচাঁদা, বাটা, বাচা, চন্দনা, খল্লা, চেলা ও টুনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন এসব মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

কাটাখালী গ্রামের জেলে কাদের বলেন, অধিকাংশ জেলে বহদ্দারের নৌকায় এক লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা চুক্তিতে পাঁচ মাসের জন্য সাগরে যান। কিন্তু সাগর ও ডাঙা দুই জায়গাতেই ঝুঁকি রয়েছে। কেউ সাগরে ভেসে যান, আবার কেউ অপহরণের শিকার হন। এভাবেই যুগ যুগ ধরে ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন জেলেরা।

দস্যু আতঙ্কে অনিরাপদ সাগর

দুবলা চর ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাগরে বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে শুঁটকি ব্যবসা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুঁটকি মৌসুম সামনে রেখে নতুন নতুন দস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, দুবলার চরের শুঁটকি উৎপাদন শুধু কয়েকজন মহাজনের ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে বড় একটি জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।

নিরাপত্তায় বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সাগরে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তায় বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে। জেলেদের গভীর সমুদ্রে একা যেতে নিষেধ করা হয়েছে। রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জেলেঘর, ডিপোঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজসম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। ৩০ অক্টোবর থেকে শুঁটকি পল্লীতে ঘর তৈরির কাজ শুরু হওয়ার কথা। একই সঙ্গে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কার্যক্রমও শুরু হবে। আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এ মৌসুম।

এলিট ফোর্স ‘এসআরবি-৬’-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। শুঁটকির সবচেয়ে বড় মোকাম দুবলার চরে এসআরবির একটি অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকে বাহিনীর সদস্যরা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ ছাড়া গোয়েন্দা নজরদারি এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে সুন্দরবনের নিরাপত্তায় কাজ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন জানান, আসন্ন শুঁটকি মৌসুমে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোস্ট গার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোরকোল, কটকা এবং আশপাশের নদী ও চ্যানেলে সার্বক্ষণিক টহল দেবে।

তিনি বলেন, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধ এবং জেলে-মহাজনদের নিরাপদে মাছ আহরণ ও ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা দিতে কোস্ট গার্ড সক্রিয় রয়েছে। যেকোনো দস্যুতার ঘটনা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় দ্রুত সহায়তা পেতে কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি।

চলতি বছরে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৫১ জন সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করায় শুঁটকি মৌসুমে দস্যুদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

দেশের ৮০ শতাংশ শুঁটকি আসে দুবলার চর থেকে

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকি পল্লীগুলো থেকে। সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলঘেঁষা শরণখোলা রেঞ্জের আওতাধীন মাঝের কিল্লা, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালার চর—এই চারটি শুঁটকি পল্লীতে প্রতিবছর শীত মৌসুমে সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির বড় কর্মযজ্ঞ চলে। পল্লীগুলো সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন।

পাঁচ মাসের মৌসুমে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জেলে ও বহদ্দাররা সেখানে গিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে শুঁটকি তৈরি ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন তাঁরা।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৮ কোটি টাকা

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে শুঁটকি পল্লী থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৭ কোটি টাকা। তবে আদায় হয়েছে প্রায় সোয়া ৭ কোটি টাকা।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবেন। সুন্দরবনে কয়েকটি বনদস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও কিছু বাহিনী এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

সামুদ্রিক মৎস্য খাতের চিত্র

মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ মোট জলসীমার আয়তন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ২০০ মিটার গভীরতার মধ্যে মাছ আহরণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। প্রায় ২৩৭টি শিল্প ট্রলার এবং ২৮ হাজার ৫৭৫টি যান্ত্রিক ও প্রচলিত মাছ ধরার নৌযান এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামুদ্রিক উৎস থেকে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ সামুদ্রিক মৎস্য থেকে পূরণ হয়।

এ ছাড়া প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন ৬ দশমিক ৭৯ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক শূন্য ৬ টন উল্লেখ করা হয়েছে। খুলনায় সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ ৯ শতাধিক মেট্রিক টন। বর্তমানে জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫। এর মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যান। প্রতিবছর এ সংখ্যা বাড়ছে। শুধু পাইকগাছার ১০টি গ্রামে জেলের সংখ্যা দেড় হাজার।

অন্যদিকে, একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলে বসবাস করেন। তাঁদের অধিকাংশই ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সমুদ্র ও উপকূলবর্তী এলাকায় মাছ আহরণ করেন।


এমএস/এসএস  



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝
Advertisement