ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি সরকারের কার্যকর ভূমিকা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম। একই সঙ্গে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলকে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আবদুস সালাম বলেন, রাষ্ট্র সবার। গণতন্ত্র রক্ষা ও দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার, বিরোধী দল ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের চেয়ে নাগরিক সচেতনতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধির মতো নিজেদের যুক্তি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে। তারা একে অপরের বক্তব্য নাকচ না করে যুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলেরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। জাতীয় সংকটে সরকারকে কীভাবে সহযোগিতা করতে হয়, তা বিরোধী দলের শেখা দরকার।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে আবদুস সালাম বলেন, তাঁর বিশ্বাস, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৮০ শতাংশ ভূমিকা জনসচেতনতার। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উদাহরণ হিসেবে হামে শিশুদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় যথাসময়ে হামের টিকা আনা হলে শিশুদের এভাবে হারাতে হতো না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতাকে জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তিনি নিজেও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারক করছেন। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করতে পারেন—এমন নির্দেশনার পর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ট্রাকের সংখ্যাও দ্বিগুণ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুস সালাম বলেন, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ডেঙ্গুর মতো সংকট মোকাবিলায় কর্মসূচি দেওয়ার পরিবর্তে বিরোধী দল লংমার্চের কর্মসূচি দিয়েছে। সরকারের সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। তবে জাতীয় সংকটে তাদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি সরকারকে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। পাঁচ বছর নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ পেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার দেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জনগণ পাঁচ বছরের জন্য সরকারকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ বিকল্প বেছে নেবে। তবে অন্য কোনো পথে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবদুস সালাম বলেন, একটি পলিথিনও পানি নিষ্কাশনের পথে পড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই নাগরিকদের যত্রতত্র ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ঢাকা দক্ষিণের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, হকার ও ব্যাটারিচালিত রিকশা নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
হকার উচ্ছেদের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, হকারদের উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁরাও এ দেশের নাগরিক এবং তাঁদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। এ কারণে হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, গুলিস্তান ও রমনা ভবনের সামনের চত্বর এবং মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস সময়ের পর মার্কেট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে কোনো রাজপথে হকার বসতে পারবেন না- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
আবদুস সালাম বলেন, বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জনগণের প্রতি সরকারের আস্থা রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভবিষ্যতে তাঁরাই দেশ পরিচালনা করবেন। তবে দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণদের উদ্যমের সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় করতে হবে। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে গণতন্ত্র রক্ষা এবং বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ডেঙ্গুবিরোধী অভিযানে আদায় করা অর্থ ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যে অনুদান হিসেবে দেওয়া যায় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুস সালাম বলেন, প্রস্তাবটি তিনি গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন। প্রধানমন্ত্রীও প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডেঙ্গুর টিকা আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলে টিকা আমদানির বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় আনা হয়েছে। আমদানির সিদ্ধান্ত হলে যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ভোগান্তির বিষয়ে আবদুস সালাম বলেন, রোগীদের বারান্দা, মেঝে কিংবা সিঁড়ির নিচে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন।
স্বাস্থ্য খাতের অতীত অনিয়ম নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরোনো সমালোচনায় না গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য। দেশের স্বার্থে ও জনগণের প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতসহ সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দুর্নীতি ও অন্যায় বন্ধ করে বিদ্যমান অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজধানীতে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য ছয়টি হাসপাতাল থাকলেও রোগীর তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক রোগীকে হাসপাতালের বারান্দা ও সিঁড়ির নিচে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলে ডেঙ্গুর টিকা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ডেঙ্গুবিরোধী অভিযানে আদায় করা অর্থ ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে অনুদান হিসেবে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের চেয়ে নাগরিক সচেতনতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সরকারি দল হিসেবে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং বিরোধী দল হিসেবে কবি কাজী নজরুল সরকারি কলেজের বিতার্কিকেরা অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ বিজয়ী হয়।
প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আবুল মো. রাইস, সাংবাদিক মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, সাংবাদিক প্রতীক এজাজ, সাংবাদিক মো. মেহেদী হাসান ও সাংবাদিক জেনিয়া কোভিদ। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ট্রফি ও সনদ বিতরণ করা হয়।
-টিএস