অনলাইন খাদ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডার একতরফা ব্যবসায়িক নীতিমালা, মাত্রাতিরিক্ত কমিশন, অস্বচ্ছ হিসাব এবং অন্যায্য জরিমানার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামজুড়ে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে তোলা মৌলিক দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় বন্দরনগরীতে ফুডপান্ডা বর্জন বা বয়কট কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য অব্যাহত রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নগরের বারকোড ফুড জাংশন রেস্তোরাঁয় আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কঠোর ঘোষণা দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল হক।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফুডপান্ডার অতিরিক্ত কমিশন ও নানাবিধ অব্যাখ্যাত ফি এবং শোষণের প্রতিবাদে প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্যা সমাধানের জন্য ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফুডপান্ডার এই একঘেয়ে ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাবের কারণেই বয়কট কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। এর আগে গত ২ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবাদ জানিয়ে ৫ অক্টোবর থেকে নগরের ছোট-বড় সব রেস্তোরাঁয় ফুডপান্ডার সেবা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
রেস্তোরাঁ মালিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, দেশীয় অনেক ডেলিভারি অ্যাপ যেখানে সহনীয় কমিশনে সেবা দিয়ে থাকে, সেখানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দোহাই দিয়ে ফুডপান্ডা ছোট-বড় রেস্তোরাঁগুলোর ওপর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চড়া কমিশন জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছে। মূল কমিশনের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট ফি, ভ্যাট, ট্যাব সংযোগ ও ইন্টারনেট সেবার নামে মাসের পর মাস অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে জটিল ও অস্বচ্ছ ইনভয়েস পাঠালেও কোন খাতে কেন টাকা কাটা হচ্ছে তা স্পষ্ট করা হয় না। এতে বিক্রয়লব্ধ অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বহুজাতিক এই কোম্পানিটির পকেটে, যার ফলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসান ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছেন।
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, ফুডপান্ডার নিজস্ব অ্যাপের কারিগরি ত্রুটি কিংবা রাইডারদের ব্যবস্থার ভুলের কারণে কোনো গ্রাহকের অর্ডার বাতিল হলেও তার দায়ভার চাপানো হয় রেস্তোরাঁর ওপর। গ্লোবাল পলিসির অজুহাতে বাতিল হওয়া পণ্যের মাত্র ৪০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দিয়ে বাকি ৬০ শতাংশ লোকসান রেস্তোরাঁকে বহন করতে বাধ্য করা হয়। একই সাথে, ট্রাফিক জ্যাম কিংবা কোম্পানির নিজস্ব জিপিএস ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার গলদের কারণে পৌঁছাতে দেরি হলেও রেস্তোরাঁগুলোকে উল্টো চড়া অংকের জরিমানা করা হচ্ছে। কোনো গ্রাহক পেমেন্ট বা খাবার নিয়ে অভিযোগ করলে রেস্তোরাঁ মালিকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা একতরফা ও স্বৈরাচারী আচরণের শামিল। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বিক্রির পাওনা টাকা পরিশোধে ১০ থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত বিলম্ব করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, কেবল রেস্তোরাঁ মালিকেরা নন, প্ল্যাটফর্মটির ডেলিভারিম্যানদের পারিশ্রমিক ও কাজের পরিবেশ নিয়েও বিভিন্ন সময় অসন্তোষের কথা সামনে এসেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিপরীতে উপযুক্ত সমন্বয় না থাকা এবং নির্ধারিত সময়ে খাবার পৌঁছানোর চাপের কারণে মাঠপর্যায়ে রাইডারদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ডেলিভারি ব্যবস্থাপনার এসব জটিলতা ও সমন্বয়হীনতার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত রেস্তোরাঁ ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একদিকে রেস্তোরাঁগুলোর কাছ থেকে চড়া কমিশন নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকেও নানা ধরনের হিডেন চার্জ আদায় করছে প্রতিষ্ঠানটি। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা ইতিবাচক হলেও ফুডপান্ডার এই একচেটিয়া ব্যবসায়িক নীতি ও চড়া কমিশনের কারণে খাবারের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার খেসারত শেষ পর্যন্ত খাবারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কেটে দিতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় কমিশন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ইনভয়েসের পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা, যুক্তিসঙ্গত পেমেন্ট নীতি, অন্যায্য জরিমানা বন্ধ এবং রাইডারদের ন্যায্য পাওনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। চট্টগ্রামজুড়ে ফুডপান্ডার সব ধরনের সেবা বর্জন অব্যাহত থাকবে এবং সমাধান না এলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর দাবির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা।
এসএ