৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমিশন, বিভিন্ন খাতে অদৃশ্য চার্জ, একতরফা জরিমানা এবং বিক্রির টাকা তুলতে ১৩ দিনের দীর্ঘসূত্রিতা- অনলাইন খাবার সরবরাহকারী বহুজাতিক প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডার শোষণমূলক বাণিজ্যিক নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকরা। নিজেদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ায় ন্যায্য অধিকার ও স্বচ্ছতার দাবিতে ফুঁসে উঠেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। অন্যদিকে, নিজেদের বাণিজ্যিক স্বেচ্ছাচারিতাকে আড়াল করতে পৃথক চুক্তি, বৈশ্বিক নীতিমালা ও গ্রাহকসেবার অজুহাত দাঁড় করিয়েছে ফুডপান্ডা- যা রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবির মুখে সম্পূর্ণ অসংগত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দাবি আদায় না হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফুডপান্ডায় অর্ডার গ্রহণ ও সেবা বন্ধ রাখার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।
১. কমিশন ও চার্জের নামে শোষণ: ফুডপান্ডার খোঁড়া যুক্তিফুডপান্ডা রেস্তোরাঁগুলো থেকে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমিশন আদায় করছে। এর বাইরে অনলাইন পেমেন্ট ফি, ভ্যাট, ট্যাবলেট ও ইন্টারনেট সেবামূল্যের নামে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এর জবাবে ফুডপান্ডা দাবি করেছে, এগুলো তাদের বৈশ্বিক সেবামূল্য, বিপণন ব্যয় এবং সরকারি বিধিবিধানের অংশ।
তবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ অসংগত ও শোষণমূলক বলছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা। তাঁদের মতে, দেশীয় ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ‘ফুডি’ যেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ কমিশনে সফলভাবে একই সেবা দিচ্ছে, সেখানে ফুডপান্ডা দ্বিগুণেরও বেশি চার্জ আদায় করে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের দোহাই দিচ্ছে। এটি মূলত দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের লাভের অংশ কেটে নিয়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পকেট ভরার পাঁয়তারা।
২. ইনভয়েসের গোলকধাঁধা ও হিসাবের জটিলতামাসের পর মাস রেস্তোরাঁগুলোকে জটিল ও অস্পষ্ট ইনভয়েস দিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, কোন খাতে কত টাকা কেন কাটা হলো, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা ইনভয়েসে থাকে না।
ফুডপান্ডার দাবি, তাদের নির্দিষ্ট ‘অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ রয়েছেন, যাদের মাধ্যমে রেস্তোরাঁগুলো সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে।
কিন্তু রেস্তোরাঁ মালিকদের মতে, বাস্তবে এই অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার প্রথা একটি বড় ধরনের ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয়। কোনো জটিলতায় হিসাবের সঠিক ব্যাখ্যা না দিয়ে একতরফা কর্তনকে ঢাকতেই এই যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়। স্বচ্ছ ও সহজ বিস্তারিত ইনভয়েস না দিয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অজুহাত দেওয়া পরিষ্কার অনিয়ম।
৩. খাবার নষ্টের ৪০% ক্ষতিপূরণ: দায়সারা নীতিফুডপান্ডার কারিগরি ত্রুটি বা রাইডারদের অব্যবস্থাপনার কারণে অর্ডার বাতিল হলে রেস্তোরাঁগুলো শতভাগ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
ফুডপান্ডা জানিয়েছে, তারা বৈশ্বিক নীতি অনুযায়ী খাবারের উৎপাদন খরচের ৪০ শতাংশ বহন করে এবং বাকিটা মার্কেটিং ব্যয় দিয়ে সামলায়।
তবে ব্যবসায়ীরা এই নীতিকে চরম একপেশে ও অন্যায্য বলে অভিহিত করেছেন। খাবার প্রস্তুতির পর রেস্তোরাঁর শতভাগ কাঁচামাল ও শ্রম ব্যয় হয়ে যায়। ফুডপান্ডার নিজস্ব গাফিলতিতে অর্ডার বাতিল হলে সেই লোকসানের ৬০ শতাংশ কেন স্থানীয় উদ্যোক্তাকে বহন করতে হবে- সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
৪. ‘এডব্লিউজিএফ’ জরিমানা ও মানসিক নিপীড়নরাইডার পৌঁছাতে দেরি করলে ‘অ্যাভারেজ ওয়েট টাইম ফাইন’ (AWGF)-এর নামে রেস্তোরাঁর ওপর মোটা অঙ্কের জরিমানা চাপানো হয়।
ফুডপান্ডার দাবি, ৭০টি দেশে তাদের আন্তর্জাতিক চালনা পদ্ধতি (SOP) অনুযায়ী সেবার মান বজায় রাখতে এই জরিমানা জরুরি।
কিন্তু রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পলিসির দোহাই দিয়ে চট্টগ্রামের ট্রাফিক জ্যাম কিংবা ফুডপান্ডার রাইডার ট্র্যাকিংয়ের ত্রুটির দায় রেস্তোরাঁর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। কোনো যৌথ তদন্ত ছাড়াই নিজেদের পরিচালনগত ব্যর্থতার মাশুল রেস্তোরাঁগুলোর জরিমানার মাধ্যমে আদায় করা করপোরেট নিপীড়ন ছাড়া আর কিছুই নয়।
৫. গ্রাহকের অভিযোগে সরাসরি অর্থ কর্তনগ্রাহক কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করলেই রেস্তোরাঁর কোনো বক্তব্য বা প্রমাণ না শুনেই সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি অর্ডারের সেবা বজায় রাখতে এই নীতি অনুসরণ করা হয় বলে দাবি ফুডপান্ডার।
তবে রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, কোটি কোটি অর্ডারের অভিজ্ঞতার অজুহাত দেখিয়ে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে পেমেন্ট কেটে নেওয়া চরম স্বেচ্ছাচারিতা।
৬. ১৩ দিনের দীর্ঘসূত্রিতা: মূলধন আটকে রাখার অপচেষ্টারেস্তোরাঁ ব্যবসা চলে প্রতিদিনের নগদ প্রবাহের (Cash Flow) ওপর। অথচ ফুডপান্ডার মাধ্যমে বিক্রি হওয়া খাবারের টাকা রেস্তোরাঁগুলোর হাতে পৌঁছাতে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লাগে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ফুডপান্ডা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে হিসাব নিষ্পত্তির দাবি করলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তবে এই দাবি কেবল কাগজে-কলমে। রেস্তোরাঁ মালিকদের অ্যাকাউন্টে প্রকৃত অর্থ জমা হতে দুই সপ্তাহের কাছাকাছি সময় লেগে যায়, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয়, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে চরম বাধা সৃষ্টি করছে।
পাল্টা হুমকির অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের দাবিব্যবসায়িক শোষণ নিয়ে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি শক্ত অবস্থান নিলে ফুডপান্ডা উল্টো সমিতির সদস্যদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও হুমকির অবাস্তব অভিযোগ এনে জলঘোলা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়। ‘পৃথক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি’র অজুহাত দেখিয়ে তারা সম্মিলিত প্রতিবাদকে স্তব্ধ করতে চায়।
তবে রেস্তোরাঁ মালিকদের মতে, চুক্তি মানেই গোলামি নয়; কোনো বিষাক্ত ও একপেশে বাণিজ্যিক চুক্তি চিরস্থায়ী হতে পারে না।
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের এই লড়াই কেবল কমিশনের হার কমানোর যুদ্ধ নয়; এটি বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার অবস্থান।
অনলাইন ফুড ডেলিভারি বাজারের এই নৈরাজ্য অবিলম্বে বন্ধ করতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে কঠোর হস্তক্ষেপে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। কমিশন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ইনভয়েসে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধ করা না হলে চট্টগ্রামের মাটি থেকে ফুডপান্ডাকে বয়কট করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।