ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ও শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের দাবি। কিন্তু এই আন্দোলনকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার দাবি, ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতার পেছনে রয়েছে ব্যাপক অভিবাসন ও ইসলাম।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।
মঙ্গলবার আন্দোলন আরও বড় আকার নেয়। দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, ওইদিন দেশজুড়ে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠনের দাবি, প্রায় দুই হাজার স্কুল অবরোধ বা বন্ধ ছিল। তবে সরকারি হিসাবে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ থাকা স্কুলের সংখ্যা ৮৯১।
আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট নিয়ে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং পুরোনো ভবনগুলোর অবস্থা খারাপ। কোথাও পানি পড়ছে, কোথাও আবার ইঁদুরের উপদ্রবের মতো সমস্যাও রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের শিক্ষাবাজেট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাও ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্সে যা ঘটছে তা ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যাপক অভিবাসন’-এর ফল। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি স্কুল বা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়; বরং ইসলাম ফ্রান্স দখলের চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের সঙ্গে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের ঘোষিত দাবির সরাসরি মিল নেই। শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লাসের সময় পর্যালোচনা করা এবং দুপুরের খাবারের জন্য শিক্ষার্থীদের আরও সময় দেওয়া।
এ ছাড়া পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবনগুলো পরিদর্শন করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষাখাতে বাজেট কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরকারকে সরে আসার দাবিও রয়েছে আন্দোলনকারীদের।
আন্দোলন সামাল দিতে ফরাসি সরকারও কিছু দাবি বিবেচনায় নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু মন্ত্রীদের শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কার, অনুপস্থিত শিক্ষকদের ঘাটতি পূরণ এবং দীর্ঘ ক্লাসের সময় পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে।
তবে আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষও হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং কয়েক শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে আন্দোলন শুরুর পর থেকে গ্রেপ্তারের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছিল।
ফ্রান্সের এই আন্দোলন নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর আগে আগস্টে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের ‘জিহাদি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। মিশিগানের প্রাইমারি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়ন পাওয়া মুসলিম প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের প্রসঙ্গেই তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের এ ধরনের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যকে আরও উসকে দিচ্ছে।
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অবশ্য এখনো মূলত শিক্ষা খাতের সংকট, শিক্ষকসংকট, স্কুলের অবকাঠামো এবং সরকারি অর্থায়ন ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিও মেনে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এএফপি