ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
অগ্নিনিরাপত্তায় ১০,৫৩৩ ভবন পরিদর্শন ফায়ার সার্ভিসের, ঝুঁকিপূর্ণ ৩,৯৩৮
✎ বাসস
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতিৃ কমাতে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস। ২০২৫ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করে ৩ হাজার ৯৩৮টি ভবন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬২২টি ভবন ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’।

পরিদর্শনে ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ও ব্যবহার উপযোগী সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির রিজার্ভার, স্প্রিংকলার, ফায়ার ডোর, প্রশিক্ষিত জনবল ও ডেডিকেটেড ফায়ার অফিসারসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। 

সাম্প্রতিক একাধিক মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনায় দেশের ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ-সহনশীলতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে কেবল অগ্নিনিরাপত্তাই নয়; ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ এবং দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা নিশ্চিত করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। 

ভূমিকম্পের পর সাধারণত অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এবং চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ভবনের সার্বিক দুর্যোগ-সহনশীলতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ভবন পরিদর্শনের ক্ষেত্রে মূলত অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং উইং না থাকায় ভবনের কাঠামোগত বিষয়ে কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে প্রস্তুতকৃত একটি নির্দিষ্ট চেকলিস্টের ভিত্তিতেই একটি স্থাপনা ‘সন্তোষজনক’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নাকি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’—তা নির্ধারণ করা হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণে নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে রয়েছে—প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি থাকা, সিঁড়িটি ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ও বাধামুক্ত থাকা এবং জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বের হওয়ার সুব্যবস্থা। সিঁড়িতে মালামাল রেখে চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করাকে সরাসরি ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়।

পরিদর্শকালে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের উপস্থিতির পাশাপাশি তা কার্যকর আছে কি না এবং তা পরিচালনায় প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে কি না, তা-ও যাচাই করা হয়। এছাড়া বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত হোস পাইপ ও ফায়ার পাম্পের অভাব এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়াকে অগ্নিনিরাপত্তায় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পরিদর্শনের সময় ভবনের আইনগত অনুমোদন ও লাইসেন্সের বিষয়গুলোও কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করা হলে সেটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

রাজউক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবনে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হলে তাকে রাখা হয় ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায়। এ ধরনের ভবনে অতিরিক্ত তলাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিঁড়ির সহজলভ্যতা এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে কি না—তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়।

এছাড়া ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে ভবনে বজ্রপাত প্রতিরোধক (লাইটিং এরেস্টার), ছাদের ওভারহেড পানির ট্যাংক এবং ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের ধারণক্ষমতা দেখা হয়। অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলায় পাম্প হাউসে ফায়ার পাম্প, অল্টারনেটিভ ডিজেল পাম্প ও জকি পাম্প থাকা আবশ্যক; শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই পাম্প হাউস না থাকাও বড় ধরনের ঝুঁকি।

পাশাপাশি বহুতল ভবনে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফায়ার ডোর এবং সিঁড়িপথ বাধামুক্ত রয়েছে কি না—তা যাচাই করা হয়। মূলত বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মেনে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্দেশনা বাস্তবায়ন ও সরঞ্জামগুলোর কার্যকরতার ওপর নির্ভর করেই ভবনের ঝুঁকির স্তর নির্ধারণ করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১০ হাজার ৫৩৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি সন্তোষজনক, ৩ হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬৫২টি ভবনের মধ্যে ৪৪২টি সন্তোষজনক, ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবাসিক ভবনের ৪৭৩টির মধ্যে ২৬১টি সন্তোষজনক, ১৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। পোশাকশিল্প কারখানার ১ হাজার ৫৩৩টির মধ্যে ৮৫৩টি সন্তোষজনক, ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পোশাকশিল্প বাদে ৭২০টি কারখানার মধ্যে ৪৩৪টি সন্তোষজনক, ২৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১ হাজার ৫৩টির মধ্যে ৫৪৫টি সন্তোষজনক, ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ৪৮০টির মধ্যে ৩২৮টি সন্তোষজনক, ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। রেস্টুরেন্টের ১ হাজার ৭১টির মধ্যে ৫৫৪টি সন্তোষজনক, ৩৭২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৪৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। শপিংমল ও মার্কেটের ১ হাজার ১৭১টির মধ্যে ৭২৩টি সন্তোষজনক, ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৮৪টির মধ্যে ৫৩৫টি সন্তোষজনক, ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। কেমিক্যাল গোডাউনের ৯১টির মধ্যে ১১টি সন্তোষজনক, ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ফিলিং স্টেশনের ১০১টির মধ্যে ৬৯টি সন্তোষজনক, ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া অন্যান্য ২ হাজার ৪০৪টি স্থাপনার মধ্যে ১ হাজার ৮৪০টি সন্তোষজনক, ৫২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস তাদের নীতিমালা ও আইন অনুযায়ী ভবন পরিদর্শন করে। অনেক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা ও নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। আবার অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের পর সেটিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও মোকাবিলার জন্য ভবনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যেমন—ফায়ার হাইড্রেন্ট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, আগুন শনাক্ত করার জন্য সেন্সর, ফায়ার ডোর এবং জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক ভবনে এসব ব্যবস্থা নেই।

তিনি বলেন, ফায়ার সেফটির নিয়মকানুন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ বা প্রস্তুত করা না হলে সেটি কম বা বেশি—যে মাত্রারই হোক, অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে হয়তো এ কারণেই অনেক ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন এসব ভবনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। 

অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম রাখা হয়, কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। আগুন লাগার সময় এগুলো কাজ না করলে তখন বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে অগ্নিকাণ্ড তুলনামূলক কম হলেও তারা নিয়মিত এসব সরঞ্জাম পরীক্ষা ও পরিবর্তন করে। আমাদের দেশে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে কিছুদিন নড়াচড়া হয়, এরপর আবার বিষয়টি ভুলে যাই। বছরের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে অগ্নিকাণ্ডও বেড়ে যায়। তাই অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি নিয়মিত মনিটর করতে হবে।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বাসস’কে বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। এ কারণে অবকাঠামোর দিক থেকে যেমন ভবনকে নিরাপদ রাখতে হবে, তেমনি অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকেও ভবনকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনবিসি অনুসরণ করে এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ভবন নির্মাণ করলে, ভবনকে অগ্নিঝুঁকি হতে নিরাপদ রাখা সম্ভব। জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সবারই এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।’

এসএ
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement