ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
স্কুলে যেতে সাঁকোই ভরসা, খালের ওপারে শিশুদের ‘ঝুঁকির পাঠশালা’
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

সকালের ব্যস্ততা তখন শুরু হয়েছে। একে একে শিশুরা আসছে বিদ্যালয়ের দিকে। কারও কাঁধে স্কুলব্যাগ, কারও হাতে বই-খাতা। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছানোর আগে তাদের সামনে পড়ে যায় আরেকটি পরীক্ষা-খালের ওপর বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো পার হওয়ার পরীক্ষা।

একজন-দুজন করে শিশুরা সাঁকোয় ওঠে। নিচে পানি, ওপরে পিচ্ছিল বাঁশ। একটু অসাবধান হলেই পা পিছলে পড়ার আশঙ্কা। তাই অনেক সময় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকাদেরই হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের হাত ধরে এক পাশ থেকে অন্য পাশে পৌঁছে দেন তারা।

এ দৃশ্য গাজীপুরের টঙ্গীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের সাতাইশ এলাকার গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

খালের মাঝখানে অনেকটা দ্বীপের মতো অবস্থান করা বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সহজ পথ বলতে এখন ওই বাঁশের সাঁকোটিই। ১১২ বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন জীবন-ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১২ সালে গুটিয়া, আন্দারুল, গুশুলিয়া ও রাজনগর গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও বিদ্যালয়ের যাতায়াত ব্যবস্থার এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। খালে পানি বাড়ে, বাড়ে স্রোত। আর সেই পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের সাঁকোটিও তখন হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সাঁকোটির বিভিন্ন অংশের বাঁশ শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে ফাঁক। একসঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থী উঠলে সাঁকোটি দুলতে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যেখানে পার হওয়াই কষ্টকর, সেখানে সাত-আট বছরের শিশুদের প্রতিদিন এই পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

অভিভাবকদের আশঙ্কা, কোনো শিশু পা পিছলে খালে পড়ে গেলে স্রোতের টানে তাকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিদ্যালয়ের মাঠের অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। নেই বাউন্ডারি দেয়াল। মাঠটি অসমতল। শিশুরা সেখানেই খেলাধুলা করে। খেলতে গিয়ে ফুটবল প্রায়ই খালের পানিতে পড়ে যায়। ফলে খেলাধুলার সময়ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়া চলছে বছরের পর বছর।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী ফারুক হাসান তুহিনের কাছে বিষয়টি খুব সরল—স্কুলে আসতে তার ভয় লাগে।

সে বলে, “বাঁশের তৈরি ভাঙা সাঁকো দিয়ে স্কুলে আসতে ভয় লাগে। আমরা এখানে একটি ভালো ব্রিজ চাই।”

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শুভশ্রী মল্লিকের অভিজ্ঞতাটি আরও ভয়াবহ। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হওয়ার সময় একবার পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিল সে। তাই তার চাওয়াও খুব বেশি কিছু নয়-বাঁশের সাঁকোর বদলে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী ব্রিজ।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা খায়রুন নেছা বলছেন, সমস্যাটি নতুন নয়।

২০১৫ সালে বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই তিনি একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো সেই দাবির স্থায়ী বাস্তবায়ন হয়নি।

তার ভাষ্য, নির্বাচন এলে অনেক সময় সাঁকোটি সাময়িকভাবে সংস্কার করা হয়। কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় কখনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে, আবার কখনো এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বাঁশের সাঁকোটিতে জোড়াতালি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করে রাখেন।

প্রধান শিক্ষিকা খায়রুন নেছা বলেন, “শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতু ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের কাছে দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।”

স্থানীয়দেরও একই দাবি। তাদের মতে, সাঁকোটির ঝুঁকির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পান। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেও।

একটি স্থায়ী সেতু হলে শুধু স্কুলগামী শিশুদের নিরাপদ যাতায়াতই নিশ্চিত হবে না, স্বাভাবিক হবে বিদ্যালয়ের পরিবেশও-এমনটাই মনে করছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের বিষয়টি তিনি অবগত। তবে বিদ্যালয়টি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ায় ব্রিজ নির্মাণের প্রাথমিক দায়িত্ব তাদের।

তিনি বলেন, “অঞ্চলটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ায় ব্রিজ নির্মাণের প্রাথমিক দায়িত্ব তাদের। তবে সিটি করপোরেশন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।”

১৯১২ সালে যে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার স্বপ্ন নিয়ে, ১১২ বছর পর সেই বিদ্যালয়ের শিশুদের একটি বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্কুলে পৌঁছানোর পথটিই।

বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স তাদের। অথচ প্রতিদিন সেই বইয়ের সঙ্গে যেন বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে ভয়।

একটি বাঁশের সাঁকো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তার হিসাব হয়তো কাগজে লেখা নেই। কিন্তু প্রতিদিন সেটির ওপর দিয়ে যাওয়া শিশুদের কাছে ঝুঁকিটা বাস্তব।

তাই গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দাবি এখন আর নতুন কোনো সংস্কারের নয়-খালের ওপর একটি স্থায়ী, নিরাপদ ও টেকসই সেতুর।

এসএ
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement