বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইরানি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তেহরান এমন একটি চুক্তি করতে চায়, যার মাধ্যমে দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। তবে সেই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এর আগে শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সাংবাদিকদের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি জানান, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউতেই এসব শর্ত উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান চুক্তি করতে চায় এবং তিনিও চুক্তির পক্ষে। তবে ইরানের বর্তমান প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শুক্রবার কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, ইরান মার্কিন দাবিগুলো পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প সন্দিহান। তিনি তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, ইরানে নতুন করে বোমা হামলার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এই অর্থনৈতিক প্রভাব যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতে ট্রাম্পের ওপর চাপও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরাঘচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিক কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা বিস্তারিত জানাননি তিনি। তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নতুন নয়; সবই এমওইউতে উল্লেখ রয়েছে এবং এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সিবিএস নিউজকে বলেছেন, পাকিস্তানে স্বাক্ষরিত এমওইউর ভিত্তিতে আগে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেই কাঠামো অনুযায়ী এগোতে রাজি হলে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান আবারও জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেবে।
১৪ দফার ওই সমঝোতায় বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। এতে মার্কিন নৌ অবরোধ ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও ছিল।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ ছিল। তবে উভয় পক্ষ আবার হামলা শুরু করলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
ইরান অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিতে ইরানি স্থাপনা ও দেশটির উপকূলের কাছে ট্যাংকারে হামলা করেছে। ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধও বহাল রয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে, পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ১০ দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৮টি জাহাজ চলাচল করেছে। কোনো কোনো দিনে এই সংখ্যা নয়টিতেও নেমে এসেছে।
এদিকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের হুতিদের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি ব্যাহত করার লক্ষ্যে হামলা জোরদার করেছে।
চলতি মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখল করেছে হুতিরা। এর মধ্যে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছের মোখা বন্দরও রয়েছে।
শনিবার ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, সৌদি আরব লক্ষ্য করে হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে সামরিক সহায়তাও চেয়েছে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে আরাঘচি শুক্রবার বলেন, ‘ধ্বংসের হুমকির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।’
এসএ