জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্যবাহী ট্রাক, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনস্থল থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত খরচ হবে। ব্যবসায়ীরা এ বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচ পাম্প, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতিতে জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। একইভাবে শিল্প-কারখানায় জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে।
এ পরিস্থিতিতে নিম্নআয় ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; সরাসরি খাদ্য সহায়তা ও আয়-সহায়তার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
সরকার ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং নীতিসুদ ৯.৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের আওতা সম্প্রসারণ, ওএমএসের মাধ্যমে কম দামে খাদ্যপণ্য বিক্রি এবং টিসিবির পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি বাড়ালে নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাজার ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী যেন অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারেন, সে জন্য বাজার তদারকি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নজরদারিতে রাখার তাগিদ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায় সামাজিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এফএস