ভেনিজুয়েলা, জাপান, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্প বিশ্বজুড়ে যেমন উদ্বেগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি দিয়ে প্লেট বাউন্ডারি অতিক্রম করেছে। ভারত, মিয়ানমার ও ইউরেশিয়ান গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, বিধায় এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত থেকে স্বল্প দূরে মিয়ানমারের ভেতরে ভারতীয় প্লেটের ওপরই বাংলাদেশের অবস্থান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা শহরের ৪-৩০ তলা পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ ভবন ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হিসাবে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি একতলা এবং ৯০ হাজার ৪৪৪টি ভবন দুই-পাঁচতলা, ৬-১০ তলা ১৩ হাজার ১৩৫টি এবং ১০ তলার ঊর্ধ্বে ৫৩৭টি। এসব ভবনের মধ্যে যেগুলো পুরনো ও বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি, সেগুলো ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) হিসাবে, ১৮৯৭ সালের মতো ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের ভালো মাটিতে নির্মিত ৭০-৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়তে পারে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরে ১ লাখ ৪০ হাজার এবং সিলেট শহরের ৩০ হাজার ভবন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীদের সতর্কবার্তা, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প বাংলাদেশে যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়া এবং ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। অথচ রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই রাজউকের হাতে। অনুমোদনহীন বহুতল ভবনের প্রকৃত অবস্থা এখনও অজানা, আর নগরজুড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ, সংকীর্ণ সড়ক, ঘনবসতি ও দুর্বল অবকাঠামো বড় ধরনের দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। যদিও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বাচলে ৫০ সদস্যের বিশেষায়িত নগর উদ্ধার (ইউএসএআর) দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং বিভাগীয় পর্যায়েও বিশেষ উদ্ধার দল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। একই সময়ে রাজউক জানিয়েছে, শিগগিরই অনুমোদনহীন ছয় তলার ঊর্ধ্বে সব ভবনের পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা শুরু হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের আগে এসব উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, আর সময় থাকতে ঢাকা আদৌ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে কি না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আরবান রেজিলিয়েন্ট প্রজেক্টের আওতায় একটা সমীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে সেগুলো ছিল বিভিন্ন থানা, হাসপাতাল এবং কয়েকটি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন।
বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫-এ একটা ধারা যুক্ত করে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। ঢাকা শহরে অনুমোদনহীন সব ভবনকে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। তার মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) না মেনে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই যেসব ভবন গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে যেসব ভবন নির্মাণে অধিক ব্যত্যয় ঘটেছে, সেগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হবে। যেগুলো সামান্য ত্রুটি ঠিক করতে পারবে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা দিয়ে অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে, নতুন বিধিমালা অনুমোদন পেলে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিএনবিসি কোড মানেনি, রাজউকের কোনো অনুমোদন নেই—সেসব ভবনকে নীতিমালার ভেতরে আনার জন্য বিধিমালা সংশোধন হচ্ছে। খুব শিগগিরই এটা যদি মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়, তাহলে রাজউকের অনুমোদনহীন ৬ তলার ঊর্ধ্বে সব ভবনের সমীক্ষা করা হবে। যেগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো ভেঙে ফেলা হবে। অনুমোদনহীন সব ভবনের দৃশ্যমান পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করা হবে, তখন বেরিয়ে আসবে কোনটা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটা কম ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের টাইম সার্কেল অনুযায়ী ৭ বা ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে। ঢাকায় এই মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাতে প্রায় ৩-৪ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটতে পারে। ভেনিজুয়েলার মোট জনসংখ্যা (সর্বশেষ ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) ৩ কোটি ৫ লাখ ১৪ হাজার ২৬০। দেশটির আয়তন ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো প্রায় ৮টি দেশের সমান। গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার জোড়া ভূমিকম্পে প্রায় ১৫০০ জন।
১৩ আগস্ট কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে এখনও অভিযান চলছে। ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ২৭০ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪৯৬ জন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি চক্র বা ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৭৬২ সালে আরাকানে ৮ বা এর কাছাকাছি মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, ৭ বা ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে।
জাইকা এবং সিডিএমপির একটি জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। কিন্তু এই ৭২ হাজার ভবন কোনগুলো, তা নির্দিষ্ট করা নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ড্যাপের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। তার মধ্যে ১৫ লাখই ছোট ভবন। এই পরিসংখ্যান ২০২২ সালের। বর্তমানে এখন ২৫-৩০ লাখের মতো ভবন রয়েছে বলে জানা গেছে। টিনশেড বা বস্তি, যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কম। কিন্তু ৬ লাখের বেশি বহুতল পাকা দালান (৪ তলার ঊর্ধ্বে) রয়েছে, যেগুলোর ৪০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজউক নিজ উদ্যোগে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন করে না। জাইকার আরবান রেজিলিয়েন্ট প্রজেক্টের আওতায় একটা সমীক্ষা করেছে। রাজধানীর কোথাও কোনো ভবন হেলে পড়লে বা ফাটল দেখা দিলেই কেবল রাজউক সেটাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর বাইরে ঢাকার কোনো ভবন নিয়ে রাজউকের কাজ করা নেই।
জানা গেছে, বাংলাদেশের আশপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে। তার মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ইন্ডিয়া বর্ডার পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার লম্বা ‘ডাউকি ফল্ট’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া প্লেট বাউন্ডারি-১ (আরাকান ফল্ট), প্লেট বাউন্ডারি-২ (নোয়াখালী থেকে সিলেট) এবং প্লেট বাউন্ডারি-৩ (সিলেট থেকে কাছাড়) একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ফল্ট রয়েছে। ভূমিকম্প হলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বাচলে ৫০ সদস্যের একটি বিশেষায়িত উদ্ধার দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যারা বড় ধরনের ভবনধস ও নগর অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া ভূমিকম্পে ফায়ার স্টেশনের নিজস্ব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যেন উদ্ধারকাজ ব্যাহত না হয়, সেজন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে কন্টেইনারের মাধ্যমে উদ্ধার সরঞ্জাম বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। সংস্থাটি থেকে জানানো হয়, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিফর্মধারী সদস্যই ভূমিকম্প ও ভবনধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত। পাশাপাশি দেশের প্রত্যেক বিভাগে ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি করে স্পেশাল রেসকিউ টিম (এসআরটি) গঠন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় একটা তীব্র আকারের ভূমিকম্প হলে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগাপ্রকল্পের কারণে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। ফলে উদ্ধারকারী বাহিনী বা যান-যন্ত্রপাতি পৌঁছতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হবে। তাছাড়া পুরান ঢাকায় যেখানে বহু বছরের পুরনো ভবন রয়েছে, সেখানকার সরু রাস্তায় উদ্ধারকারী বাহন চলার মতো অবস্থাও নেই। ভেঙে পড়তে পারে বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ঢাকার মাঠগুলোর পাশেই বহুতল ভবন, যার ফলে ভবন ধসে মাঠ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।