ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লিতে। বিদ্যুৎ সংকটে কমেছে উৎপাদন, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাঁত শ্রমিকদের আয়ে। যে শ্রমিকরা আগে সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করতেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের অনেকের আয় নেমে এসেছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও সাপ্তাহিক আয় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁত মালিকরাও। বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সুতা ও রঙের বাড়তি দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, এই ত্রিমুখী চাপে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পাবনা-সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের স্থানীয় বেসিক সেন্টারগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা। দুই জেলায় বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়ে আসছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পটির পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে উৎপাদিত কাপড়ের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
পাবনার বেড়া উপজেলা তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুল গফুর বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক তাঁতিকে চড়া দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা না পেলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও বড় সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে শাহজাদপুর হাটের পাইকারি বিক্রেতারা জানান, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাপড়ের দামও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা। ফলে হাটগুলোতে কাপড়ের বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে রংপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রতি হাটে ৪ থেকে ৮ ট্রাক কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন। বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী মাত্র ১ থেকে ২ ট্রাক কাপড় কিনছেন।
পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও আতাইকুলার হাটগুলোতে একসময় প্রতি সপ্তাহে কয়েক শত কোটি টাকার লেনদেন হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এসব হাট থেকে শাড়ি ও লুঙ্গি কিনতেন।
স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব হাটকে ঘিরে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাপড় কেনাবেচা ও ব্যাংক লেনদেন হতো। বর্তমানে তা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার আহমেদ শাহ আল জাবের বলেন, কখনো কখনো ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সমস্যার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। সারাদেশে রেশনিংয়ের মাধ্যমে লোড ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁতি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, উৎপাদন উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে সংকট কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প।
এসএস