রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় আমিষজাত পণ্যের দাম থামছেই না। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে গরু ও খাসির মাংসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় তা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। মাংসের এই চড়া বাজারের ধাক্কায় সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও সস্তা মাছও এখন সাধারণের পাত থেকে গায়েব হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে আমিষজাত পণ্যের এই লাগামহীন দরের চিত্র দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে কেজিপ্রতি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৮০০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা বা প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ।
একই চড়া সুর খাসির মাংসের বাজারেও। আগে যেখানে প্রতি কেজি খাসির মাংস মিলত ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকায়, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
মাংসের বাড়তি দামের কারণে যে পরিবারগুলো বিকল্প হিসেবে ডিম বা সস্তা মাছের ওপর নির্ভর করত, সেখানেও তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। খুচরা বাজারে এক ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ঠেকেছে ২০০ টাকায়। আর ‘গরিবের মাছ’ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ ও তেলাপিয়ার কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা পর্যন্ত।
কাওরান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ভ্যানচালক আমিনুল ইসলাম সজিবের জীবনযাত্রার গল্পে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের আসল টানাপোড়েন। তিনি জানান, সারারাত ভ্যানে পণ্য টেনে তার দৈনিক আয় হয় মাত্র ৬৫০ টাকা, যা দিয়ে তাকে পুরো সংসার চালাতে হয়।
হতাশা প্রকাশ করে সজিব বলেন, "আগে এক থাল ভাত একটা ডিম দিয়ে খেয়ে নিতে পারতাম। এখন ডিমের যে দাম, তা-ই কিনতে কষ্ট হচ্ছে। যে টাকা আয় করি তা দিয়ে গরুর মাংস কেনার ক্ষমতা নাই, শেষ কবে কিনেছি মনেও নাই।‘তিনি আরও যোগ করেন, ‘ছোট মেয়েটা মাঝে মাঝে মাংস খেতে চায়, কিন্তু এই আয়ে সংসারের অন্যান্য খরচ চালিয়ে তা কেনার কোনো উপায় থাকে না। ব্রয়লার মুরগিও কেনা হয় না অনেক দিন, আর পাঙাশ-তেলাপিয়া কিনতেও এখন হিমশিম খাচ্ছি।’
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গরুর মাংসে সম্প্রতি হওয়া কেজিপ্রতি ৫০ টাকা মূল্যবৃদ্ধিই সজিবের মতো শ্রমজীবীদের দৈনিক মোট আয়ের প্রায় ৮ শতাংশের সমান। যা প্রমাণ করে—সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও এসব পরিবারের বাজেটে কতটা বড় ধাক্কা দেয়।
বাজারের এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজারে বর্তমানে সব ধরনের পণ্যের দামই অতিরিক্ত। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। মূলত অসাধু চক্র সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটছে। বাজারে এখনই কঠোর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে, তদারকি জোরদারের আশ্বাস দিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিমসহ নিত্যপণ্যের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি চালানো হচ্ছে। কৃত্রিম কারসাজি করে কেউ দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে সরকারি প্রতিশ্রুতি ও বাজার তদারকির দাবির মধ্যেও বাস্তবে মাংস, ডিম ও মাছের বাজারে কমছে না চড়া ভাব, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায়।
এসএ