রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার চরে পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগ দেখে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য আটটি স্কুলে ছুটি ঘোষণা করেছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের বই হাতে পানির মধ্য দিয়ে স্কুলে যেতে দেখা যায়। পদ্মার পানি বৃদ্ধি ও বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় পরে স্কুলটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
জানা গেছে, বাঘা উপজেলার পদ্মার চরে অবস্থিত চকরাজাপুর হাইস্কুল। ১৯৭৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পদ্মার ভাঙনের কারণে ১৯৯৮, ২০১২ ও ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি তিন দফা স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে যে স্থানে বিদ্যালয়টি রয়েছে, সেটিও যেকোনো সময় পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৭ মিটার। বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার দশমিক ৭৮ মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল।
তবে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ৩ মিটার কমেছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গেজ রিডার এনামুল হক।
এ বিষয়ে চকরাজাপুর হাইস্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবন্য খাতুন, আকাশ হোসেন, সাগর আলী, আখি খাতুন এবং নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিলা খাতুন ও নিয়তি খাতুন বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করেছে। দুই দিনের মধ্যে স্কুলের মাঠ ডুবে গেছে। ক্লাস না করলে সমস্যায় পড়তে হবে। তাই এই দুর্যোগের মধ্যেও স্কুলে যাচ্ছিলাম। দুর্যোগের কারণে স্যারেরা স্কুল ছুটি দিয়েছেন। বর্তমানে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে আছে। স্কুলেও পানি, বাড়িতেও পানি—লেখাপড়া করব কী করে? লেখাপড়ার কোনো পরিবেশ নেই।’
চকরাজাপুর হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পদ্মার ভাঙনের মুখে রয়েছে স্কুলটি। ভাঙন থেকে স্কুলটি মাত্র ৫ মিটার দূরে। স্কুলের মাঠ ও চারটি টিনের ঘর পদ্মায় চলে গেছে। যেকোনো সময় পাকা ভবনও পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম। দূরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে পারছিল না। কাছাকাছি কিছু ছেলে-মেয়ে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি মাড়িয়ে স্কুলে এসেছিল। কষ্ট করে ক্লাস নেওয়া হচ্ছিল। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরও স্কুলে আসা দুরূহ হয়ে পড়ে। এর মধ্যেও কেউ কেউ স্কুলে আসছিল। স্কুলে আসতে গিয়ে অনেকের জামাকাপড় ভিজে গেছে, এমনও দেখেছি। তারা স্কুলে এসে ছুটি নিয়ে চলে গেছে। দুর্যোগের কারণে স্কুল ছুটি দেওয়া হয়েছে। থাকার জায়গা নেই, পড়বে কী করে? তবে পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, দুই-চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার বলেন, ‘এই স্কুলে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৩৭ জন। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। পদ্মা নদীর ভাঙতে ভাঙতে স্কুলের মাঠ নদীতে চলে গেছে। স্কুলের তিন কক্ষবিশিষ্ট পাকা ভবন ও টিনের আরও চার কক্ষের ঘর পদ্মার ভাঙন থেকে ৫ মিটার দূরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে পানি এসে স্কুলের মাঠ ডুবে গেছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে পানি উঠেছে। বিষয়টি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অবহিত করে স্কুল ছুটি দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে পলাশি ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, পশ্চিম চরকালিদাসখালী, ফতেপুর পলাশি, লক্ষ্মীনগর ও চরকালিদাসখালীসহ ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পলাশি, চকরাজাপুর ও পূর্ব চকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—এই তিনটি বিদ্যালয় বন্যাকবলিত না হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মামুনুর রহমান বলেন, ‘পদ্মার চরে নয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ছয়টিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনটি বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল আযম বলেন, ‘ভাঙনের কারণে চকরাজাপুর, কালিদাসখালী ও লক্ষ্মীনগর মৌজার চিহ্ন হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এগুলোর স্থান বলতে কিছু নেই। সম্পূর্ণটাই নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে স্কুলে পানি ওঠায় স্কুল ছুটি দেওয়া হয়েছে।’
এছাড়া চরের শতাধিক বাড়িঘর এবং শত শত বিঘা জমিতে রোপণ করা আমবাগান, কুলবাগান, পেয়ারাবাগান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলি জমি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
এএইচ/আরএন