তিতাসের গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে বিল, আর বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে রান্না করতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হচ্ছে সাধারণ মানুষের। রাজধানীজুড়ে তীব্র আবাসিক গ্যাস সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন লাখ লাখ গ্রাহক। একদিকে গ্যাসহীনতার ভোগান্তি, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, এলপিজি সিলিন্ডার ও লাকড়ি কেনার অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে দ্বিগুণ ও ত্রিগুণ ব্যয়ের চাপে দিশেহারা নগরবাসী। এ অবস্থায় সেবা না দিয়ে নিয়মিত বিল নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে মারাত্মক ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার প্রায় এক যুগের বাসিন্দা রোমানা আক্তার রুনি জানান, গত দুই মাস ধরে তাদের এলাকায় গ্যাস একপ্রকার গায়েব হয়ে গেছে। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে এই বাসায় থাকি, এত বড় সংকট আগে দেখিনি। একদিকে গ্যাস না থাকলেও বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় কারেন্ট বিলও বহুগুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে আবার না খেয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সব দিক থেকেই চরম সংকটে পড়ে গেছি।’
একই ভোগান্তির কথা জানান শুক্রাবাদের গৃহিণী খাদিজা বেগম। লাইনের গ্যাস না থাকায় শেষ পর্যন্ত ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে লাকড়িতে রান্না করতে হচ্ছে তাকে। তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে গ্যাসের ১ হাজার ৮০ টাকা বিল তো ঠিকই দিচ্ছি, তার ওপর আবার ৩ হাজার টাকার লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। এভাবে সংসার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
গ্রাহকরা জানান, এ পরিস্থিতি যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। লাইনের গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে রাইস কুকার, ইনডাকশন চুলা কিংবা এলপিজি সিলিন্ডার ও নতুন চুলা কিনতে গিয়ে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা গলে যাচ্ছে। পরবর্তীতে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ ও এলপিজি সিলিন্ডারের বাড়তি খরচ তো আছেই। এক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, ‘গ্যাস সেবা পাচ্ছি না, আবার সিলিন্ডার ও বাড়তি বিদ্যুৎ বিল—দুটোই দিতে হচ্ছে। এটা তো স্পষ্ট জুলুম! সেবা না দিতে পারলে অন্তত বিল নেওয়া বন্ধ রাখা উচিত।’
জ্বালানি না দিয়েও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করাকে অন্যায় ও অনৈতিক হিসেবে দেখছেন দেশের ভোক্তা অধিকার সচেতন মহল। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘পণ্য বা সেবা না দিয়ে অর্থ আদায় করা চরম অপরাধমূলক কাজ। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন দায়িত্বহীন আচরণ করতে পারে? ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো যখন ভোক্তা সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছেই প্রতারিতবোধ করে।’
এমতাবস্থায় যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ নেই, সেখানকার গ্রাহকদের বিল মওকুফের নির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) আবেদন জানিয়েছে একটি নাগরিক সংগঠন। বিষয়টিকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে এবং সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।