অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ২৯ আগস্ট শনিবার বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট এলাকায় রত্নাই নদীর ওপর নির্মিত বহুল প্রত্যাশিত রত্নাই সেতু।
সেতুটির উদ্বোধন ঘিরে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। সেতুটি চালু হলে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাট সদর এলাকার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দুই জেলার মধ্যে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে নতুন গতি সঞ্চার হবে। কমবে যাতায়াতের সময় ও পরিবহন ব্যয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত কোরবানির ঈদের আগেই সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেতু দিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। তবে আগামী ২৯ আগস্ট হবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রত্নাই সেতু চালু হলে ফুলবাড়ী-ধরলা সেতুর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে এ এলাকার যোগাযোগ আরও সহজ, দ্রুত ও গতিশীল হবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমে আসায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে রত্নাই সেতু। এর দৈর্ঘ্য ১৩০ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ৫ মিটার। ‘প্রজেন্ট ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড কংক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।
রত্নাই নদীর ওপর থাকা ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতুর কারণে আট বছরেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ী-ধরলা সেতুর পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি।
২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর রত্নাই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়ক, রং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৩ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ফুলবাড়ী-ধরলা সেতুর উদ্বোধন করেন। কিন্তু লালমনিরহাট অংশে রত্নাই নদীর ওপর থাকা জরাজীর্ণ বেইলি সেতুর কারণে সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করতে পারত না।
ফলে ফুলবাড়ী-ধরলা সেতু উদ্বোধনের পরও দুই জেলার মানুষ এর প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নতুন রত্নাই সেতু চালু হলে সেই দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ফুলবাড়ীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্মৃতি রায় ও শ্রাবন্তি মণ্ডল বলেন, “বাড়ি থেকে রাজশাহী যেতে নানা ভোগান্তির কারণে রংপুর গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। রত্নাই সেতু চালু হলে ফুলবাড়ী থেকে সরাসরি রাজশাহীর দিকে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমবে।”
ফুলবাড়ী সদরের মেসার্স হক ট্রেডার্সের মালিক এমদাদুল হক বলেন, “ফুলবাড়ী-ধরলা সেতু উদ্বোধনের পরও রত্নাই সেতুর অভাবে আমরা এর পূর্ণ সুফল পাইনি। অবশেষে দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। সেতুটি চালু হলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার পথ কমে আসবে। এতে পণ্য পরিবহন খরচও অনেকটা কমবে।”
ফুলবাড়ীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ওয়াহেদ আলী এবং বালারহাট বাজারের ব্যবসায়ী আবু তালেব ও আবুল কাসেম বলেন, “এখন নাগেশ্বরী হয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ঘুরে মালামাল আনতে হয়। রত্নাই সেতু চালু হলে এই অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে না। এতে সময় ও পরিবহন খরচ—দুটিই সাশ্রয় হবে।”
ফুলবাড়ীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল আজিজ মজনু ও শাহিনুর রহমান শাহিন বলেন, “রত্নাই সেতু চালু হলে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি ফুলবাড়ীর ব্যবসা-বাণিজ্যেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।”
উদ্বোধনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ এস. এম. রিয়াজ মোর্শেদ বলেন, জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্বিত হলেও বর্তমানে দ্রুতগতিতে কাজ শেষ করা হয়েছে। কোরবানির ঈদের চার দিন আগেই সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে গাইড ওয়াল বিভিন্ন রঙে সাজানো হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ২৯ আগস্ট বিকেল ৩টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর মূল সেতুর রেলিংয়ের কিছু কাজ সম্পন্ন করা হবে।
লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দেবাশীষ সাহা বলেন, “সেতুর মূল কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে সংযোগ সড়ক ও রঙের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটির উদ্বোধন হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকবেন।”
এসি/আরএন