ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
মেশিন বন্ধ, অর্ডার ঝুঁকিতে; গ্যাস সংকটে শিল্পে অশনিসংকেত
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০০ পিএম আপডেট: ২১.০৮.২০২৬ ৬:০৪ পিএম
X

গ্যাস সংকট যেন ক্রমেই বড় হচ্ছে দেশের শিল্পখাতে। কোথাও কমে গেছে উৎপাদন, কোথাও দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে বয়লার ও মেশিন। গ্যাসের চাপ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ডাইং, ফিনিশিং, সিরামিকসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্পের কার্যক্রম। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে লোকসান, আর সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় তৈরি হচ্ছে রপ্তানি আদেশ হারানোর শঙ্কা।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও। ফলে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

মেশিন আছে, উৎপাদন নেই

দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ঘুরে পাওয়া চিত্রে দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। কোথাও এক শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

গাজীপুরের একটি সিরামিক কারখানায় দৈনিক ২২ হাজার পিস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬ হাজারে। অর্থাৎ সক্ষমতার বড় একটি অংশই এখন অব্যবহৃত থাকছে।

একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাতেও। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল বয়লার চালানো না গেলে কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ফিনিশিং- সব ধাপেই তৈরি হয় জট।

ফলে কারখানার মেশিন সচল থাকলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদনের চাকা থেমে যাচ্ছে।

একটি কারখানা বন্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শিল্পে

তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনব্যবস্থা একটি দীর্ঘ সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল।

সুতা → কাপড় তৈরি → ডাইং → ফিনিশিং → গার্মেন্টস → প্যাকেজিং → রপ্তানি।

এই চেইনের একটি ধাপে সমস্যা হলে তার প্রভাব পরবর্তী ধাপেও পড়ে।

বিশেষ করে ডাইং ও ফিনিশিং ইউনিটে গ্যাসের সংকট তৈরি হলে গার্মেন্টস কারখানাগুলো সময়মতো প্রয়োজনীয় কাপড় পায় না। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়।

এ কারণে গ্যাস সংকটকে শুধু একটি কারখানার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ হলে তার প্রভাব পড়ে কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, শ্রমিক এবং শেষ পর্যন্ত রপ্তানির ওপর।

অর্ডার নিয়ে কেন বাড়ছে উদ্বেগ?


বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা। বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে অর্ডার দেন। উৎপাদনে বিলম্ব হলে সেই অর্ডার সময়মতো পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্যাস সংকটে যদি বারবার উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, সেখানে উৎপাদন অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।

আজকের গ্যাস সংকট তাই শুধু আজকের উৎপাদন কমাচ্ছে না; এটি ভবিষ্যতের অর্ডার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বিকল্প জ্বালানিতে চলছে, কিন্তু খরচ বাড়ছে

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কিছু কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

একদিকে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বাড়ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে।

একই পণ্য প্রতিযোগী দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কম খরচে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তার পক্ষে কম দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ-  গ্যাস সংকট → বিকল্প জ্বালানি → উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি → প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়া।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান নিয়ে

গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন কমে গেলে উদ্যোক্তাদের আয় কমে, কিন্তু কারখানার অনেক স্থায়ী ব্যয় ঠিকই বহন করতে হয়।

দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চললে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমানো, শিফট কমানো কিংবা শ্রমিকের সংখ্যা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এখনই গ্যাস সংকটের কারণে দেশজুড়ে লাখো শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন- এমন চিত্র না থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শিল্প ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগও মূলত এখানেই- কারখানা সচল না থাকলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান কতদিন নিরাপদ থাকবে?

বিনিয়োগেও পড়তে পারে প্রভাব

একটি নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের আগে উদ্যোক্তারা জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন।

কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মেশিন স্থাপন করার পর যদি নিয়মিত গ্যাস না পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমে যায়।

ফলে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট শুধু বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন কমাতে পারে না, নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।

আর বিনিয়োগ কমলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও কমে যায়।

গ্যাস সংকটের অর্থনৈতিক হিসাব


একটি কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি হয় কয়েকটি স্তরে।

● প্রথমে কমে যায় উৎপাদন।
● তারপর বাড়ে উৎপাদন খরচ।
● সময়ে পণ্য সরবরাহ না হলে ঝুঁকিতে পড়ে রপ্তানি।
● রপ্তানি কমলে কমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়।
● দীর্ঘদিন লোকসান হলে কমতে পারে বিনিয়োগ।
● আর সবশেষে চাপ তৈরি হয় কর্মসংস্থানে।

অর্থাৎ গ্যাস সংকটের প্রভাবকে শুধু ‘কারখানা চলছে না’ দিয়ে পরিমাপ করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়।

সমাধান কোথায়?


শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, শুধু গ্যাসের পরিমাণ বাড়ানো নয়, প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ।

কারখানা কখন গ্যাস পাবে, কতক্ষণ পাবে- এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন। শ্রমিকের শিফট নির্ধারণ, কাঁচামাল কেনা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা এবং রপ্তানির সময়সীমা- সবকিছুই এতে বাধাগ্রস্ত হয়।

তাই শিল্পখাতকে সচল রাখতে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শিল্পের সামনে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্পের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখো মানুষের জীবিকা।

তাই গ্যাস সংকটের সমাধান শুধু শিল্প মালিকদের উৎপাদন স্বাভাবিক করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

এখন প্রশ্ন হলো- গ্যাসের অভাবে যে মেশিনগুলো আজ বন্ধ, সেগুলো কতদিন বন্ধ থাকবে?

কারণ সংকট যদি সাময়িক হয়, শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সংকট দীর্ঘ হলে তার প্রভাব একসময় কারখানার গেট পেরিয়ে শ্রমিকের ঘর, রপ্তানি বাজার এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও পৌঁছাবে।

মেশিন বন্ধ হওয়া তাই শুধু একটি কারখানার নীরবতা নয়- এটি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সতর্ক সংকেত।


-টিএস
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝