হকার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। একই সঙ্গে ঢাকা শহরে হকার ও রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বলেও জানান তিনি।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) কার্যালয়ে ‘স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ট্রেড লাইসেন্স সেবা’ শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডিসিসিআই ও ডিএসসিসি যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ঢাকা শহরকে সবচেয়ে জঞ্জাল করেছে হকাররা। হকার ও অটো বন্ধ করতে গেলে তারা আন্দোলন করে। এই শহর সাধারণ মানুষের। শহরকে ভালো রাখতে সাধারণ মানুষকে আরও সোচ্চার হতে হবে।
তিনি বলেন, নিবন্ধন ছাড়া কোনো রিকশা চলতে দেওয়া হবে না। একইভাবে হকারদেরও লাইসেন্স ও নম্বর দেওয়া হবে। তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করে কিউআর কোডের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, আমরা এরই মধ্যে চেষ্টা করেছিলাম, অনেক জায়গা হকারমুক্ত করে ফেলেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী মানবিক। উনি বলেছেন, এরা তো বাংলাদেশেরই মানুষ। এদের তো একটা বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। সেটার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, হকার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সবাইকে কথা বলতে হবে ও নিজ নিজ এলাকায় নেতৃত্ব দিতে হবে। আপনারা কথা না বললে হবে না। ওরা সমাবেশ করে বলছে, ওদের সরানো যাবে না। কেন সরানো যাবে না? তাহলে রাস্তায় কী হবে? এই রাস্তায় কীভাবে চলবে? চলছে না তো। কোনো ডিসিপ্লিনও মানে না, কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল মানে না। কিছুই মানে না।
আব্দুস সালাম বলেন বলেন, বর্তমানে শুধু রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতেই নয়, বিভিন্ন মহল্লাতেও হকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এভাবে চলতে পারে না। হকারদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে।
হকারদের লাইসেন্স ও নম্বর দেওয়া হবে
ঢাকা শহরের হকার ও রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আব্দুস সালাম বলেন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো রিকশা চলবে না। আজকে ইচ্ছা হলো যে কোনো দিন পাঁচ টাইপের রিকশা নিয়ে নেমে যাবেন বা একটা ভ্যান নিয়ে হকারগিরি করবেন- এটা হবে না। ইট মাস্ট স্টপ।
রিকশা ও হকারের সংখ্যা নির্ধারণ করে পুলিশের সহায়তায় তাদের লাইসেন্স দেওয়া হবে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, হকার কতগুলো হবে, রিকশা কতগুলো হবে- সে অনুযায়ী তাদের আমরা লাইসেন্স দেবো। হকারদের আমরা লাইসেন্স দেবো, নম্বর দেবো এবং তাদের একটা আইডির আওতায় আনবো। তার টোটাল বায়োডাটা থাকবে সেখানে, যেন কিউআর কোডে চলে আসে যে এই লোকটা কোথা থেকে আসছে, তার পরিচয় কী; যেন কোথাও কোনো অনিয়ম করতে না পারে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছুটা সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, গত ৫ আগস্টের পর রাজধানীতে হকার ও রিকশার সমস্যা অনেক বেড়েছে।
‘প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই’
হকার বসানোর ক্ষেত্রে কিছু ব্যবসায়ী ও মার্কেটের দোকানদারদের ভূমিকার সমালোচনা করেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় মার্কেটের দোকানদাররা দোকানের সামনে আরেকটি দোকান বসিয়ে দেন। আবার ফুটপাতে দোকান বসিয়ে সেখান থেকে ভাড়া নেওয়া হয়। এগুলো চাঁদাবাজি। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই, সেটা যে দলেরই হোক। কোনো দল চাঁদাবাজি করতে পারবে না।
চাঁদাবাজি বন্ধে শুধু প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র দিয়ে কাজ হবে না উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চান তিনি। ‘জনগণকে সহযোগিতা করতে হবে। আপনারা লিডার, ব্যবসায়ীরা- আপনারা নেতৃত্ব দেন একটা এলাকায়। প্রত্যেকটা এলাকায় তো আপনারাই নেতৃত্ব দেন। আপনারাই সমাজটাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। আপনাদের ভূমিকা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু আলাদা হতে হবে।’ বলেন আব্দুস সালাম।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ এলাকায় নেতৃত্ব নিলে অনেক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।
যানজট নিরসনে উদ্যোগের আহ্বান
রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, মতিঝিলের পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘আজ গুলিস্তান থেকে সদরঘাট যেতে পারে না মানুষ। হকার দেখেন, একটার ওপর আরেকটা বসে। রাস্তায় রিকশা যেভাবে চলে, যানবাহন চলতে পারে না। আপনি গাড়ি নিয়ে চলতে পারবেন না, বাস চলতে পারবে না।’ যোগ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
এ সময় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পরিবহন ও বাসসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়েও অভিযোগ করা হয়। এসব বিষয় খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
‘বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে সরকার’
রাজধানীর বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়েও কথা বলেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব সমস্যার সৃষ্টি হয়নি; বরং উত্তরাধিকার সূত্রে এসব সমস্যা পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজ অনেকে বিদ্যুতের জন্য দোষ দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরকারকে, গ্যাসের দোষ দেন। আরে ভাই, এই সরকার আসার পরেই কি এই সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে? এটা উত্তরাধিকার সূত্রে এই সরকার পাইছে।’
কেমিক্যাল-পলিথিন ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নিয়ে যা বললেন
সভায় কেমিক্যাল ও পলিথিন ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ও উঠে আসে। এ বিষয়ে আব্দুস সালাম বলেন, কিছু পণ্য সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় সিটি করপোরেশনের এককভাবে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ নেই। আপনারা কেমিক্যাল আর পলিথিন ব্যবসায়ীরা, আপনাদের লাইসেন্সের কথা বলছেন- এটা আমার ইস্যু না। এটা সরকার থেকে নিষিদ্ধ করা।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ করিম ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমানসহ অন্যরা।
টিআইএস