ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
গ্যাস সংকটে চাপে শিল্প-অর্থনীতি, দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে সংকট
✎ তরিকুল ইসলাম সুমন
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৫ পিএম
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় এক সংকটের মুখে। এক সময় যে প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি ছিল, সেই গ্যাসই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। দেশের প্রায় সব খাতেই গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে। নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না। ফলে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। চলছে না শিল্প কল কারখানা। ক্ষতি হচ্ছে কোটি টোটি টাকা। এসব ক্ষতি পোষাতে শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে বন্ধ রাখতে হচ্ছে শিল্প।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীরগতি, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান বিলম্ব এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির উচ্চ ব্যয়-এই চারটি কারণে সংকট দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিয়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে-বিবিয়ানা, তিতাস, হবিগঞ্জ, জালালাবাদ, কৈলাশটিলা, রশিদপুর, বাখরাবাদ এবং ফেঞ্চুগঞ্জ ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন গ্যাস উৎপাদন হলেও অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন আগের তুলনায় কমে এসেছে। বিশেষ করে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত ২ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেওয়া  ডিও লেটারে বলা হয়েছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন, কূপ খনন, ওয়ার্কওভার এবং অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর প্রকৃতি অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ভিন্ন। এসব প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ব্যবহৃত সুবিধা-ব্যয় অনুপাত (বিসিআর), অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আই আর আর) এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ই আই এ)-এর ফলাফল মূলত অনুসন্ধানে তেল বা গ্যাস পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে সমীক্ষা সবসময় কার্যকর হয় না। আর এ কারণেই তিনি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ক্ষেত্রে এই ছাড় চান।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সংশোধিত উৎপাদন-বণ্টন কাঠামোর (পিএসসি) আওতায় দেশের ৪৭ টি ব্লকের মধ্যে মোট ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ব্লক অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি ব্লক গভীর সমুদ্রে অবস্থিত। ২০২৬ সালের ২৪ মে সরকার এই অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করে, যেখানে প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ নভেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশের অফশোর অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লাইসেন্সিং রাউন্ড-২০২৬ (সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দরপত্র)-এর তথ্যপ্যাকেজ এখন পর্যন্ত ৬টি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ বা ক্রয় করেছে। এর বাইরে ব্রিটিশ বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) এই দরপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘স্থলভাগে ও সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে পেট্রোবাংলা প্রস্তুত রয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায়ও গ্যাস অনুসন্ধানে অফশোর-অনশোরে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসের মোট মজুদ ছিল প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ২২ টিসিএফের বেশি গ্যাস ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭ থেকে ৮ টিসিএফ। এই মজুদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে গেলেও সরকার নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবার গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে-সাঙ্গু এবং সেমুতাং উল্লেখযোগ্য। 

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার এমএমসিএফডি ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতির কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে লোড ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে। দেশে আবাসিক খাতে নিবন্ধিত গ্যাস সংযোগ রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ পরিবারের। এই খাতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ এমএমসিএফডি। কিন্তু অনেক সময় সরবরাহ নেমে আসে ৩০০ এমএমসিএফডি বা তারও নিচে। ফলে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার সময় গ্যাসের চাপ কমে যায়। 

 ব্যবসায়ীদের মতে, এই সংকট অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আদেশ বাতিল ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি। গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং, ওয়াশিং ও স্টিম অপারেশন ব্যাহত হওয়ায় পোশাক কারখানাগুলো তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ উৎপাদনে ধুঁকছে। এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে উৎপাদন ক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছে।

কোহিনূর কেমিক্যালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। তার মধ্যে আবার গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বলছে, হবিগঞ্জে তাদের শিল্পপার্কে উৎপাদন নেমেছে ৪০-৪৫ শতাংশে। গ্যাস–সংকটের কারণে ক্যাপটিভ জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বন্ধ। 

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে অনেক পণ্যই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তার মধ্যে রপ্তানি পণ্যও আছে। তিনি দ্রুতই সংকট সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলো ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রেখেছে। অতীতে ফিলিং স্টেশন থেকে আমরা সিলিন্ডার ভরে গ্যাস নিতে পারতাম। এখন দেওয়া হচ্ছে না। তিতাসকে চিঠি দিয়েও আমরা কোনো সাড়া পাইনি। প্রাইভেট গাড়িতে সিএনজি না দিয়ে শিল্পকারখানায় দেওয়া দরকার।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানাসহ সবক্ষেত্রেই গ্যাস নির্ভর হিসেবে গড়ে উঠেছে। যখন সংকট হয়েছে তখন একটি গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। মূলত বহুমুখী উৎস ব্যবহার না করার কারণেই সংকট বেড়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক ও জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, শুধু এলএনজির ওপর নির্ভর করলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি দক্ষতা-এই তিনটি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

টিআইএস



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝