বিশ্বকাপের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব, সদস্য দেশগুলোর জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা এবং ফিফা-উয়েফার টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’। সেই আলোচনায় হঠাৎ বাংলাদেশের নামও উঠে আসে। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত প্রকল্পে সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ।
তবে ঢাকার অবস্থান ভিন্ন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে বাংলাদেশ কোনো আগাম সমর্থন দেয়নি। বরং বাফুফের নির্বাহী কমিটি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার আগেই ফিফা প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছে।
গণমাধ্যমের সামনে তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘আমরা কোনো অগ্রিম সাপোর্ট বা কনফার্মেশন দিইনি। কোনো ব্যক্তির জন্যও দিইনি, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও দিইনি। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামের যে প্রোগ্রামটি নিয়ে মেম্বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছিল, আমাদের ইসি তা বিবেচনা করার আগেই ফিফা সেটি বাতিল ঘোষণা করেছে।’
কী ছিল ফিফার প্রস্তাবে?
প্রস্তাবটি ছিল বড় ধরনের। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ মালিকানা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার কথা ছিল। বিনিময়ে ফিফার প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ ৪০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ পেত। বর্তমানে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য সেই অঙ্ক ১০ মিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ফিফার সদস্য দেশগুলোর আর্থিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারত। তবে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি বিশ্বকাপের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল হলেও বিতর্ক থামেনি।
ইস্যুতে জড়াচ্ছে ভূরাজনীতিও
ফিফা ও উয়েফার অবস্থানের পার্থক্য বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাফুফে সভাপতি মনে করছেন, উয়েফার জোরালো ভূমিকার কারণে বিষয়টি এখন শুধু ফুটবল প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে ভূরাজনীতির মাত্রাও যুক্ত হচ্ছে।
তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘ইস্যুটা ইউয়েফার একটি স্ট্রং ভূমিকা রাখার কারণে জিওপলিটিক্যাল রূপ নিচ্ছে। এ কারণে আমি মনে করি ইসির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্পোর্টস মিনিস্ট্রি এবং ফরেন মিনিস্ট্রির সঙ্গেও কথা বলতে হবে। সার্বিক বিষয়ে আলাপ করেই আমরা ভবিষ্যতে আমাদের অবস্থান জানাব।’
তার এই বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। ফিফার মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার বড় কোনো সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত মত বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে অবস্থান নিতে চায় না বাফুফে। কোনো ইস্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে ক্রীড়া প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ফেডারেশন।
ইসি সিদ্ধান্তের আগেই বাতিল প্রকল্প
তাবিথ আউয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, বাফুফের অবস্থান নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। নির্বাহী কমিটিতে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পরই কোনো বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হয়। ফলে ইসি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাংলাদেশের সমর্থনের খবর প্রকাশিত হওয়াকে বাফুফের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে মানছেন না তিনি।
‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কাঠামো, ফিফার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিফা-উয়েফার ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সামনে আরও জোরালো হতে পারে।
-টিএস