জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রদর্শনীতে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনের নানা ছবি স্থান পেলেও সেখানে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি, বক্তব্য বা স্বাধীনতার ঘোষণার উল্লেখ নেই! একইভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের ভূমিকা নিয়েও প্রদর্শনীতে কোনো আলোচনা দেখা যায়নি।
এ নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে জামায়াতে ইসলামী যে তুলনামূলক ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল, ইতিহাসের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন বিতর্কিত উপস্থাপন সেই ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে বাদ দেওয়া নিছক ঘটনা নয়; এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে এ ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়নি। বরং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বলেই তাকে প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুর মধ্যে রাখা হয়নি।
জামায়াত আমিরের এই ব্যাখ্যাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জিয়াউর রহমানের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার কারণ কী-এ প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রসঙ্গ এলে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও কেন কোনো আলোচনা নেই!
প্রদর্শনী নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে তৈরি করা হয়নি। বরং আওয়ামী লীগ কীভাবে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, মূলত সেটিই সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস উপস্থাপন করা হলে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি অবশ্যই সেখানে থাকা উচিত ছিল।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারও বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস চাই।’
এদিকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে জামায়াত আমিরের পুরোনো বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত বিজয় দিবসের সমাবেশে শফিকুর রহমান প্রশ্ন তুলেছিলেন-স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া জিয়াউর রহমানের স্বীকৃতি কেন নেই। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান কবে ও কোথায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, সেটিও প্রশ্ন করেছিলেন তিনি।
সেই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?
অবশ্য জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দুই বক্তব্যের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। তাদের দাবি, বর্তমান প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং তার বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা; এটি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ দলিল নয়।
সব মিলিয়ে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ প্রদর্শনী এখন আর কেবল একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে ঘিরে বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐতিহাসিক বয়ান এবং জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান- সবকিছুকে একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হতে চায়, তখন ইতিহাসের সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোকে তারা কীভাবে উপস্থাপন করছে, সেটিও জনগ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের বক্তব্যে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে তার ভূমিকা নিয়ে এমন নীরবতা কেন-এ প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও জামায়াত বলছে, প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ও আগের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই, তবু রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের ভূমিকা প্রদর্শনীতে অনুপস্থিত থাকাও সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হলে সেই ইতিহাসের বিতর্কিত ও অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলোকেও কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটি নিয়েও স্বচ্ছতা প্রত্যাশিত। ‘জামায়াতে ইসলামী কি এখনো নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে মানতে নারাজ?’- প্রদর্শনী ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর মধ্যে এটিও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে যে নতুন ও তুলনামূলক ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছে, এই বিতর্ক সেই ভাবমূর্তিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইতিহাসের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দলটির অবস্থান অস্পষ্ট থাকলে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি শুধু একটি ছবি প্রদর্শনীতে কার ছবি আছে বা নেই- সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী কি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে, নাকি রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই ইতিহাসের নির্বাচিত কিছু অংশকে সামনে আনা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে কতটা স্পষ্ট, ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ অবস্থান নেয় তার ওপর।
কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস শুধু অতীতের বিষয় নয়-এটি বর্তমানের রাজনৈতিক বৈধতা, জনআস্থা এবং ভবিষ্যতের জনসমর্থনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
জামায়াতের আমিরের ব্যাখ্যা যাই হোক, জনপরিসরের প্রতিক্রিয়া বলছে- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানকে উপেক্ষা করে প্রদর্শনী সাজানো কোনোভাবেই ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ মানুষ।
-টিএস