মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুক্রবার (৭ আগস্ট) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের পাশাপাশি তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করাই এ চুক্তির লক্ষ্য।
প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর চুক্তিটি স্বাক্ষর হলো। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।
শুক্রবার সৌদি আরবে যান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। সেখানে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সৌদি আরবে পৌঁছে মক্কায় ওমরাহ পালন করেন।
সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইয়েমেনের হুথি বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার মুখে পড়েছে। এসব সংঘাত দেশটির তেল রপ্তানি ও উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি বড় ধরনের হামলার শিকার না হলেও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে পড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন দুই দেশই।
দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে চুক্তিপাকিস্তান কয়েক দশক ধরে সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ, প্রশিক্ষণ বিমানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামরিক সহযোগিতা রয়েছে।
২০২৩ সালে সৌদি আরব তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোন কেনার বিষয়ে চুক্তি করে। আঙ্কারা এটিকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এই সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক হলেও ভবিষ্যতে অর্থনীতি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতেও তিন দেশের সহযোগিতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, মুসলিম বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র এমন সময়ে একত্রিত হয়েছে, যখন আঞ্চলিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। তার মতে, এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক মনসুর আহমেদ মনে করেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সৌদি আরবের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এই সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
তবে এই চুক্তিতে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি। কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি মূলত ভারতের সম্ভাব্য হুমকিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা কোন পর্যায়ে যায়, তা এখন নজরে রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেও নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা।
-টিএস