ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
বাংলাদেশের পোশাক খাতে বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পকে উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক খাতে রূপান্তরে বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো। এ জন্য কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার), ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্বয়ংক্রিয় সেলাই যন্ত্রপাতি এবং গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী তারা।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (কোটরা) ঢাকার উপপরিচালক লি সুং-হুন (ড্যানিয়েল লি) এ কথা জানান।

দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের রূপান্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে লি সুং-হুন বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতকে শুধু পরিমাণভিত্তিক উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে পরিণত করতে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লি সুং-হুন বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে এ খাত এখনও মূলত প্রাকৃতিক তন্তুনির্ভর এবং গড় মূল্য সংযোজনের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।

কোটরার এই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মূল্য শৃঙ্খলে আরও উপরে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কৃত্রিম তন্তু, ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনে এমএমএফের ব্যবহার বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

তিনি বলেন,আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।এখন শুধু সাধারণ পোশাক নয়, ফাংশনাল ফ্যাব্রিক, পারফরম্যান্স ওয়্যার এবং টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রযুক্তি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।

কোরিয়ান এই কর্মকর্তা বলেন, স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই ব্যবস্থা, গার্মেন্টস ও ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আধুনিকায়নে তারা তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন—পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং উদীয়মান পরিবেশগত ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।

তার মতে, প্রাকৃতিক তন্তু থেকে কৃত্রিম তন্তু ও ফাংশনাল উপকরণভিত্তিক উৎপাদনে স্থানান্তর বাংলাদেশের পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। এ ক্ষেত্রে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা যৌথ উদ্যোগ ও প্রযুক্তি অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

লি জানান, বাংলাদেশের টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

তিনি বলেন, কোরিয়ান নির্মাতারা বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী কারখানা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির চাহিদা বাড়তে দেখছেন। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কাছেও কোরিয়ান যন্ত্রপাতি গুণগত মান ও দামের ভারসাম্যের কারণে জনপ্রিয়।

ইউরোপীয় বাজারের নতুন নিয়মের প্রসঙ্গ তুলে লি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, পরিবেশবান্ধব নকশা (ইকো-ডিজাইন) এবং কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত কঠোর বিধিমালা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) ভবিষ্যতে রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড হয়ে উঠবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারকদের সহায়তা করতে কোরিয়ার আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে কোটরা।

লি বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা রয়েছে। তবে এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই পরিবেশগত অর্জনকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।

তিনি আরও বলেন, কোটরা বাংলাদেশি কারখানাগুলোকে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বর্জ্যপানি শোধনব্যবস্থা উন্নয়নে সহযোগিতা করছে। কারণ বর্তমানে উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত সক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে কোটরা উপপরিচালক বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশে কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৯৭৮ সালে ডেইউর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রায় দক্ষিণ কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওই সময় বাংলাদেশি কর্মীদের কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে এসে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের প্রায় ৭০ শতাংশই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে কেন্দ্রীভূত। এ কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দুই দেশের জন্যই একটি অভিন্ন অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।

তবে পোশাকশিল্পের বাইরেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেলি সুং-হুন। ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি, ভোগ্যপণ্য, অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আগামী দিনে দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), ক্যানসারের ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং বায়োলজিকস উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

ভোগ্যপণ্যের বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণের ফলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কোরিয়ান সৌন্দর্যপণ্য (কে-বিউটি)-এর চাহিদা বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে কোরিয়ান উৎপাদকরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড উন্নয়নে আগ্রহী।

তিনি আরও বলেন, স্মার্ট অবকাঠামো, বুদ্ধিমান পরিবহন ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সম্প্রতি কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) চুক্তি স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে লি বলেন, এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা সম্প্রসারণে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, সিইপিএ আলোচনা সম্পন্ন হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি—এসব বিষয় আগামী কয়েক বছরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

বাংলাদেশকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে লি বলেন, দেশের বিপুল তরুণ কর্মশক্তি, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার, বিশ্বমানের তৈরি পোশাক খাত এবং প্রায় পাঁচ দশকের কোরিয়ান ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়াতে কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক নীতির ধারাবাহিকতা, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করা।

লি সুং-হুন বলেন, এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সিইপিএ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি আগামী দিনে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।

সূত্র: বাসস



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝