ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি আর পূবালি বাতাস—ইলিশের মৌসুমের সব অনুকূল পরিবেশ থাকলেও মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশ। গভীর সাগরে মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর জেলেরা আশায় বুক বেঁধে নদীতে নামলেও অধিকাংশই ফিরছেন খালি হাতে। ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার হাজারো জেলে।
জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হলেও জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণেও আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়ছে না। নদীপাড়ের আড়তগুলোতে নেই আগের সেই কোলাহল। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
উপকূলীয় চরফ্যাশনের মেঘনা নদীর তীরবর্তী নতুন সুলিজ ঘাট, সামরাজ মাছঘাটসহ বিভিন্ন জেলেপল্লি থেকে প্রতিদিন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ট্রলার নিয়ে মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন জেলেরা। কিন্তু জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না থাকায় অধিকাংশ ট্রলারই ফিরছে লোকসান নিয়ে। জেলেদের অভিযোগ, নদীতে গিয়ে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে নৌযানের জ্বালানি ও অন্যান্য খরচও উঠছে না। ফলে সংসার চালাতে অনেকেই নতুন করে ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন।
স্থানীয় কয়েকজন জেলে জানান, সম্প্রতি প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ করে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মাছ বিক্রি করে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এরপর আরও কয়েকদিন নদীতে গিয়েও তেমন কোনো মাছ পাননি। তাদের ভাষায়, "নদীতে এখন মাছ নেই বললেই চলে।"
সামরাজ মাছঘাটের বরফকলের ব্যবস্থাপক কবির হোসেন বলেন, প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশের আশায় ট্রলার নিয়ে জেলেরা নদী ও সাগরে যাচ্ছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে তীরে ফিরছেন।
চরফ্যাশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সামরাজ ঘাটের জেলে মজিদ শাহ ও নজরুল ইসলাম মাঝির দাবি, সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিং এবং ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং দিন দিন মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় সাধারণ জেলেদের ওপর।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী আহসান কবির লিটন বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ মাছ কেনাবেচা হচ্ছে, তাতে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মৌসুম শেষে দাদনের টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে পরিস্থিতির উন্নতির আশা দেখছেন মৎস্য বিভাগ। চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নদীর মোহনায় নতুন চর জেগে ওঠা, নাব্যতা সংকট, উজানের পানির প্রবাহ ও বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিপথ ও ইলিশের বিচরণপথেও পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে না। তবে সামনের সময়ে ইলিশের উপস্থিতি বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৫ হাজার ৭৪ জন। এছাড়া নিবন্ধনের বাইরে আরও প্রায় ২০ হাজার জেলে রয়েছেন। ইলিশের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই বিপুলসংখ্যক জেলের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এসএফ/আরএন