গোপন বিয়েকে ঘিরে সমাজে নানা ধরনের আলোচনা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে ইসলামী শরিয়তে ‘গোপন বিয়ে’ বলতে কী বোঝায় এবং এর বিধান কী—তা নির্ভর করে বিয়েটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তার ওপর।
ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে, যদি কোনো বিয়ে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া শুধু বর-কনের ইজাব-কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেটি সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল ও অকার্যকর। কারণ ইসলামে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর উপস্থিতি। সাক্ষী ছাড়া ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলেও তা বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হয় না।
অন্যদিকে, যদি দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং পরে বিয়ের বিষয়টি মানুষকে জানাতে বা প্রকাশ করতে কোনো বাধ্যবাধকতা কিংবা নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তাহলে সেটিকে ইসলামের দৃষ্টিতে ‘গোপন বিয়ে’ বলা হয় না। এ ধরনের বিয়ের বৈধতা নিয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।
তবে এমন ক্ষেত্রে, যেখানে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলেও সাক্ষীদের বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, সে বিষয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেক আলেমের মতে, এতে সাক্ষী রাখার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। কারণ বিয়েতে সাক্ষী রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিয়ের বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষিত থাকে, মানুষের মধ্যে অযথা সন্দেহের সৃষ্টি না হয় এবং বৈধ ও অবৈধ সম্পর্কের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় থাকে।
তাই ইসলামে বিয়ে শুধু ইজাব-কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনে বিয়ের বিষয়টি সমাজে স্বীকৃত ও প্রকাশিত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ বলে ইসলামি আইনজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
জামিয়া আল-আজহারের সাবেক গ্র্যান্ড ইমাম শায়খ মাহমুদ শালতুত (রহ.) গোপন বিয়ের বিধান সম্পর্কে বলেন, যদি বিয়ের সময় দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কড়া অঙ্গীকার নেওয়া হয় যে তারা এই বিয়ের কথা কারও কাছে প্রকাশ করতে পারবেন না, এই পরিস্থিতিকে সব ফকীহ একবাক্যে অপছন্দনীয় বা মাকরুহ বললেও এর বৈধতা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
একদল ফকীহ মনে করেন, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি থাকলেই বিয়ে আর গোপন থাকে না এবং তা বৈধ গণ্য হয়। পরে গোপন রাখার পরামর্শ বা অনুরোধ বিয়ের বৈধতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।
কিন্তু ইমাম মালেকসহ (রহ.) অন্য একদল ফকীহর মত হলো, বিয়ের খবর গোপন রাখার নির্দেশ বা সমঝোতা সাক্ষ্যের মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেয়। বিয়েতে সাক্ষী রাখার আসল উদ্দেশ্যই হলো বিয়ে খবর সর্বসমক্ষে ঘোষণা করা; যেন মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হয়, সমাজে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি না হয় এবং হালাল ও হারামের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘হালাল ও হারামের পার্থক্য হলো দফ বাজানো ও উচ্চশব্দে বিবাহের ঘোষণা দেওয়া।’
বিয়ের কথা চেপে রাখার শর্তে সাক্ষী রাখা হলেও তা প্রকৃত ঘোষণা হিসেবে গণ্য হতে পারে না। কেবল সাক্ষীর সংখ্যা বাড়ালেই কোনো গোপন বিষয় প্রকাশ্য হয়ে যায় না। চারজন বা দশজন মানুষের মধ্যেও গোপন বিষয় গোপনই থেকে যায়, যদি তারা তা গোপন রাখার ব্যাপারে সমঝোতা করে।
সুতরাং যে গোপন বিয়ে সাক্ষীর উপস্থিতিতে হওয়ার পরও গোপন রাখার অঙ্গীকার বা সমঝোতার কারণে অবৈধতা ও অপছন্দনীয়তার দোলাচালে দোলায়মান, যা পাপাচারের মতো গোপনীয়তার ভাব বহন করে, একজন খাঁটি মুসলিমের উচিত তা থেকে দূরে থাকা। দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হলো সংশয়পূর্ণ পথ পরিহার করে নির্ভেজাল ও স্পষ্ট পথ অবলম্বন করা।
যে বিয়ে করার পর মানুষের মনে সার্বক্ষণিক আতঙ্ক, ভয়, পরিবার ও সমাজের কাছে প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার উদ্বেগ কাজ করে, তা কখনো আল্লাহ তাআলার উপহার হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে যে বিয়েকে মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তা কখনোই এরকম ভীতিপ্রদ হতে পারে না। যে বিয়ে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে, বংশমর্যাদা রক্ষা করে এবং আত্মীয়তার নতুন বন্ধন তৈরি করে তা এ রকম গোপনীয় হতে পারে না।
ইসলাম সব ক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছতা পছন্দ করে। বিয়ে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে হওয়া জরুরি হওয়ার উদ্দেশ্য হলো বিয়ে যেন প্রকাশ্য থাকে, গোপনীয় না থাকে। যদি সাক্ষীর উপস্থিতি সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে না পারে, তবে তা আল্লাহর দেওয়া বিধানকে ফাঁকি দেওয়ার একধরনের কৌশল মাত্র; শরিয়তের দৃষ্টিতে যা অগ্রহণযোগ্য।
নিজের দ্বীন ও আত্মসম্মানকে কলঙ্কমুক্ত রাখা প্রতিটি মুমিনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। গোপন বিয়ে একজন মানুষকে দ্বীনি ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই মারাত্মক সংশয়ের মুখে ফেলে দেয়। একদিকে যেমন বিয়ের প্রচার সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিসকে উপেক্ষা করা হয়, অন্যদিকে সামাজিক লজ্জা ও অপমানের ভয় মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। তাই শয়তানের প্ররোচনা ও অন্যান্য অজুহাতগুলো কঠোরভাবে দমন করে বিয়ে প্রকাশ্যেই করা উচিত। সাময়িক যে কোনো অসুবিধার চেয়ে ইমান ও ইজ্জত রক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি।
এসআর