জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্তে বড় ধরনের অসঙ্গতির চিত্র উঠে এসেছে। অনেক মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল ভুল উল্লেখ থাকায় তদন্ত কর্মকর্তারা মাসের পর মাস প্রকৃত ঘটনা যাচাই করতে পারেননি। এমনই এক ঘটনায়, প্রায় এক বছর তদন্তের পর প্রকাশ পায়—মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাস্থলই ছিল ভুল।
গুলিবিদ্ধ হন মোহাম্মদপুরে, মামলা হয় পল্টনে
জুলাই আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়া শাকিল মোল্লা ওরফে বাপ্পি ২০২৫ সালের ৬ মে একটি হত্যা চেষ্টা মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ৩৪৬ জনকে আসামি করা হয়।
এজাহারে দাবি করা হয়, তিনি রাজধানীর পল্টনের ‘আজাদ প্রোডাক্টস’ গলিতে গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, প্রকৃত ঘটনা ঘটেছিল মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে, যেখানে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে তার বুকে গুলি লাগে।
দুই তদন্ত কর্মকর্তা ব্যর্থ, তৃতীয় কর্মকর্তার তদন্তে বেরিয়ে আসে সত্য
পল্টন থানার দুই তদন্ত কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে মামলার সত্যতা যাচাই করতে ব্যর্থ হন। কারণ তারা বারবার পল্টনের কথিত ঘটনাস্থলে তদন্ত চালিয়ে কোনো সাক্ষ্য বা তথ্য পাননি।
পরবর্তীতে তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আতিকুজ্জামান মামলার বাদীর বক্তব্য, চিকিৎসা নথি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনাস্থল শনাক্ত করেন। গত ৩০ জুন তিনি আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
আমি জানতামই না মামলা হয়েছে—শাকিল মোল্লা
তদন্ত প্রতিবেদনে শাকিল মোল্লার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। তিনি জানান, মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
তার ভাষায়, আমাকে সরকারি সহায়তার কথা বলে একজন আইনজীবীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে জানতে পারি, মামলা হয়েছে। শাকিল আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তিনি মোহাম্মদপুরেই ছিলেন, পল্টনে নয়।
আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
শাকিলের অভিযোগ, আইনজীবী রুবেল ভূঁইয়া ও এক নিকট আত্মীয় তাকে না জানিয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী রুবেল ভূঁইয়া বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চান না।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আতিকুজ্জামান বলেন, ঘটনা মোহাম্মদপুরে, অথচ তদন্ত করতে হয়েছে পল্টনে। ফলে দিনের পর দিন প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি ঘটনাস্থল সঠিক থাকত, অনেক আগেই তদন্ত শেষ করা সম্ভব হতো।
তার মতে, বাদী নিজেই মামলা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না; যারা তাকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়েছেন, তারাই ভুল তথ্য দিয়েছেন।
শুধু একটি নয়, আরও বহু মামলায় একই সমস্যা
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী—জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর ৫০ থানায় হয়েছে ৭০৭টি মামলা। এর মধ্যে ১২৬টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। অন্তত ২১টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে— ১৪টি মামলায় এজাহারে ঘটনাস্থল ভুল উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টিই পল্টন থানার মামলা। এছাড়া ৩৭টি মামলায় প্রকৃত ঘটনাস্থলের উল্লেখই নেই।
সারাদেশেও তদন্তে ধীরগতি
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ১,৮২৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে।
তদন্তে বিলম্বের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—এজাহারে ভুল তথ্য, একই ঘটনায় একাধিক থানায় মামলা, প্রকৃত ভুক্তভোগীর অসহযোগিতা, এবং তদন্তের সময় বাদী বা সাক্ষীদের অনুপস্থিতি।
ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তাড়াহুড়ো করে তথ্য সংগ্রহের কারণে একাধিক অসঙ্গতি তৈরি হয়েছিল।
তার দাবি, একই ঘটনার একাধিক মামলা এবং ভুল থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো ইতোমধ্যে সংশোধনের প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে এবং তদন্ত এখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু একটি মামলার ভুল নয়; বরং জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ায় তথ্যগত ত্রুটি কতটা বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ভুল ঘটনাস্থল, বাদীর অজ্ঞাতে মামলা এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আরও সতর্কতা এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।