বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পনেরো বছরের শাসনামলে বিশেষ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং দলীয় কোটার অপব্যবহার করে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে এনেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি সংস্কারের অংশ হিসেবে দুই মাস আগে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সরাসরি নির্দেশনায় গঠিত জেলা পর্যায়ের তদন্ত কমিটিগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন এখন সদর দপ্তরে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র স্ক্রিনিংয়ের পর কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং উচ্চপদস্থ ক্যাডার কর্মকর্তা পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ২২ হাজার সদস্যের নিয়োগে মারাত্মক অনিয়ম, জালিয়াতি ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের তথ্য মিলেছে। এই চূড়ান্ত তালিকাটি যেকোনো দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হতে পারে এবং এরপরই বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুরু হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তদন্তের স্বার্থে জেলাভিত্তিক কমিটিগুলো বিগত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া প্রায় ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত নথি ও সার্ভিস বুক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেছে। এই বিশাল তালিকার মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় অংশটি হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের কনস্টেবল, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। এছাড়া এসআই ও এএসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার এবং বাকি ১ হাজার সদস্য ইন্সপেক্টর, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, কনস্টেবল ও এসআই পদে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে নিয়োগ হওয়ায় এই দুই পদে তদবির ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল সবচেয়ে বেশি। ক্যাডার অফিসারদের ক্ষেত্রে পিএসসির মাধ্যমে কিছুটা স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা হলেও, সাব-অর্ডিনেট র্যাঙ্কের পদগুলোতে তৎকালীন মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সরাসরি প্রভাব থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নথিতে পাওয়া গেছে।
তদন্তে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, বিগত সরকারের আমলে মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকার পরও অনেক জেলার যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বিশেষ ১০টি জেলাকে নিয়োগের ক্ষেত্রে একচেটিয়া অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। এই বিশেষ জেলাগুলোর তালিকায় রয়েছে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার।
অভিযোগ রয়েছে, এসব জেলার তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও দলীয় নেতারা ঢালাওভাবে সুপারিশ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য জেলার প্রার্থীরা মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন বা কোটি টাকার বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে এই ১০ জেলার ভুয়া কোটায় চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের একটি বড় অংশের ফাইলে তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সই করা ‘ডিও লেটার’ বা আধা-সরকারি পত্র সংযুক্ত পাওয়া গেছে। এমনকি অনেক জেলা পুলিশ লাইন্সে নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ঢাকা থেকে নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হতো বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি জেলা কমিটিগুলো এই ২২ হাজার কর্মকর্তা ও সদস্যের পারিবারিক রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে তাদের অতি-উৎসাহী ভূমিকাও খতিয়ে দেখেছে। তদন্তে জানা গেছে, দলীয় বিবেচনায় চাকরি পাওয়ায় এদের অনেকেই পেশাদারত্বের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সরাসরি দলীয় নেতাকর্মীদের মতো ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড় ও নির্যাতনে যুক্ত ছিলেন। একই সাথে, ‘রাতের ভোট’ বা বিতর্কিত নির্বাচনে সহায়তা করার দায়ে তৎকালীন এসপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী যেসব ওসির চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর একটি প্রশাসনিক তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুলিশের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকেই মূল আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে; তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো নিরীহ কর্মকর্তা বা সদস্য যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এসএ