নৌবাহিনীর অন্যতম দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। গত ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট চবকের শীর্ষ পদে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নৌ ফ্লিটের সাবেক এই সফল কমান্ডার। তার বর্ণাঢ্য সামরিক ক্যারিয়ার, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানের দৃঢ় নেতৃত্ব চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের করে তুলছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে কতিপয় জটিলতার মুখে বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের একাংশের মাঝে এক ধরনের শঙ্কা ও অচলাবস্থার তৈরি হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত ও সরাসরি পদক্ষেপে সেই সংকটের দ্রুত অবসান ঘটে।
তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে বন্দর ভবনের সামনে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সাথে টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠকে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। চেয়ারম্যানের এই সফল মধ্যস্থতা ও আশ্বাসের পর শ্রমিকেরা দ্রুত কাজে ফিরে আসেন এবং বন্দরের চাকা সচল রাখা সম্ভব হয়।
বন্দরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিজের কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন এবং বন্দর সম্পূর্ণ সচল আছে। কেউ যদি এখন তাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে চেয়ারম্যান নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আন্তর্জাতিক দক্ষ অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই চুক্তির নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়াসহ সামগ্রিক বিষয়ে তিনি দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছেন।
বন্দরের উন্নয়নে নিজের জাতীয়তাবাদী ও স্বচ্ছ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্ট জানান, দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি করা হবে না। এছাড়া এ চুক্তির বিষয়ে কোনো প্রকার অপতথ্য ও বিভ্রান্তিতে কান না দেওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রতি আহ্বান জানান।
কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করা রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান ১৯৮৭ সালে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে ডিসটিংশনসহ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৯০ সালে নির্বাহী শাখায় কমিশন লাভ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ ‘বিএনএস বঙ্গবন্ধু’-সহ বিভিন্ন ফ্রন্ট লাইন যুদ্ধজাহাজ এবং ‘কমান্ডার ফ্লোটিলা ওয়েস্ট’ হিসেবে ওয়েস্টার্ন ফ্লোটিলা কমান্ড করেছেন। নৌ সদর দপ্তরে ডিরেক্টর পারসোনেল সার্ভিস (ডিপিএস), ডিরেক্টর ব্লু-ইকোনমি (অ্যাডহক) এবং ডিরেক্টর নেভাল ট্রেনিং (ডিএনটি)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিইডব্লিউ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সেনা কল্যাণ সংস্থার ডিজিএমআইএস হিসেবে ব্যাপক প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
জাতিসংঘের অধীনে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোতে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে তিনটি প্রধান বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিরন্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় তিনি অসামান্য ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফ্লিট কমান্ডারদের সম্মেলন, থাইল্যান্ডে ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের’ অধীনে বিজনেস ম্যাচিং অ্যাক্টিভিটি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন আয়োজিত ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
তিনি জার্মান নেভাল একাডেমি, তুর্কি আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কলেজ এবং ইউএস নেভাল কমান্ড কলেজের একজন অত্যন্ত মেধাবী গ্র্যাজুয়েট। তুরস্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি দুটি করে মোট চারটি মাস্টার্স ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। অসামান্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘অসাধারণ সেবা পদক’ (ওএসপি) অর্জন করেন এবং কৃতিত্বের সাথে দীর্ঘ ১২ বছর সফলভাবে সী-সার্ভিস সম্পন্ন করেছেন।
পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী এই সামরিক কর্মকর্তা তুর্কি, জার্মান, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে একজন একনিষ্ঠ পাঠ অনুরাগী, যার প্রধান আগ্রহের বিষয় হলো ‘লিডারশিপ’ বা নেতৃত্ব। ব্যক্তি জীবনে তিনি আইরিন জামানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ এবং মুহতাসিম ইয়াসার ও সারান ইয়াসার নামে দুই পুত্র সন্তানের গর্বিত জনক।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের এই বিশাল আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান ও প্রশাসনিক দক্ষতা চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী দিনে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
-টিএস