পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারও বড় ধরনের সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা, নিরাপত্তা সদস্যদের অপহরণ ও হত্যা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রদেশটি।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আরও বড় একটি দাবি-বাংলাদেশের মতো বেলুচিস্তানও নাকি পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রদেশটির অধিকাংশ এলাকা এখন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর নিয়ন্ত্রণে এবং পাকিস্তানের ভাঙন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কিন্তু এসব দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটা?আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, আল জাজিরা, এপি, ডন ও জিও নিউজ–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এখন আরও সংগঠিত ও প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে-এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা কেন?১৯৭১ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈষম্য, সামরিক দমন-পীড়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, নিজস্ব সরকার, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে, বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্বীকৃত স্বাধীন সরকার নেই, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই এবং পাকিস্তানের প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিচারব্যবস্থা এখনও প্রদেশটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
বিএলএ কি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?বিএলএ বহু বছর ধরেই স্বাধীন বেলুচিস্তানের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে 'স্বাধীনতা ঘোষণার' দাবি ছড়িয়েছে, তার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কোনো বড় শহর বা পুরো প্রদেশের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও বিএলএর হাতে যায়নি। পাকিস্তানের কোয়েটাসহ প্রধান শহর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
তাহলে কেন এত আলোচনা?সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে আফগান সীমান্তে টিটিপির তৎপরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তান বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ধারণা করছেন, পাকিস্তান হয়তো ভাঙনের দিকে যাচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে 'পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে' বা 'বেলুচিস্তান ইতোমধ্যেই স্বাধীন'—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাস্তবতা কী বলছে?বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের অংশ এবং সেখানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যকর রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা, মানবাধিকার ইস্যু, সম্পদের বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জটিল আকার ধারণ করেছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির কিছু ঐতিহাসিক মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও, বাস্তব রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই 'বাংলাদেশের পর এবার বেলুচিস্তান'-এমন দাবি এখনই তথ্যসমর্থিত নয়।
-টিএস