আষাঢ়ের শেষ সময়ে এসে গত গভীর রাত থেকে রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে অবিরাম বৃষ্টি। ভোরের দিকে তা রূপ নেয় মুষলধারে। দিনভর বিরতিহীনভাবে আকাশ মেঘে গর্জন করে চলেছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। টানা এই বৃষ্টিপাতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমর সমান পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, পল্টন, মতিঝিল, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট যাওয়ার নতুন রাস্তা, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা, শনির আখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর ১৩, কালশী, হাতিরঝিলের কিছু অংশ, গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুর এবং বারিধারা এলাকার সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে গেছে।
আজ সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। শেষ আষাঢ়ের এই আকস্মিক বৃষ্টিতে রাজধানীর অলিগলিগুলোর অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পথচারীদের যেন আক্ষরিক অর্থেই সাঁতার কেটে পার হতে হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীতে সর্বশেষ ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মাসে এর আগে দেখা যায়নি। আর সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৯৭ মিলিমিটার। আবহাওয়া অফিস আরও জানায়, আজ সারা দিনই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে নগরীর অসংখ্য সড়ক ও নিচু এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ পথচারীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাস্তায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতি যেমন কম ছিল, তেমনি গণপরিবহনের সংখ্যাও ছিল একেবারেই নগণ্য। জরুরি প্রয়োজনে যারা বাইরে বেরিয়েছেন, তাদেরই একজন সালাম মিয়া। পল্টন থেকে একটি বিশেষ কাজে গুলশানের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া এই ভুক্তভোগী জানান, ‘ভোর থেকেই ঝুম বৃষ্টি চলছিল, রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন দুটোই ছিল খুব কম। পুরানা পল্টন থেকে গুলশান আসার পথে একাধিক এলাকায় সড়কে পানি জমে থাকতে দেখেছি, যা আমাদের স্বাভাবিক যাতায়াতকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।’
বিজয় সরণি ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের দিকে আসা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আলম হোসেন শোনালেন একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘আসার পথে একাধিক সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেছি। জমে থাকা সেই পানিতে দু-একটি সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের গাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতেও দেখেছি। তবে আজ সড়কে যানবাহনের চাপ বা মানুষের ভিড় তেমন একটা ছিল না। অবশ্য যারা প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেককেই জলাবদ্ধতার তীব্র ভোগান্তি মাথায় নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে।’
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, রাতব্যাপী এই ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের উভয় পাশে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিক দুর্ভোগ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে এবং সড়কে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করতে ডিএনচ্ছির কর্মীরা মাঠে নেমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
অপরদিকে, ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বনানী ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকার নিচু সড়কে পানি জমে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আজ রোববার বেলা ১১টার পর ট্রাফিক পুলিশের গুলশান বিভাগের ফেসবুক পেজে এক সতর্কবার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
পুলিশের ওই বার্তায় জানানো হয়, টানা ভারী বর্ষণের ফলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেট এবং মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে এবং কিছু স্থানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কাকলী মোড়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে আসা যানবাহন এবং নিচের সড়কে চলাচলকারী সাধারণ যানবাহনকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হচ্ছে।
সব মোটরযান চালক ও পথচারীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে পুলিশের বার্তায় বলা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ পরিহার করুন। জলাবদ্ধ এলাকায় ধীরগতিতে যানবাহন চালান এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করা সম্ভব হলে তা অনুসরণ করুন। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা মেনে চলে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসএ