একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পোশাক খাত। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট ও ক্ষেত্র বিশেষে শ্রমিক অসন্তোষে গড়ে প্রতি মাসে ৩-৪টি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, যার ফলে গত ছয় মাসে এ খাতে ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি হাসান মাহমুদ খান।
অনেক কারখানা তার উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না করতে পারায় কয়েক বছর লোকসান টেনে বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও নতুন কারখানা খুলছে; কিন্তু তা রপ্তানি আয়কে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে পারছে না। গত অর্থবছরে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাতটির প্রবৃদ্ধিতে ঋণাত্মক ধারাই দেখা গেছে।
অথচ কোভিড মহামারীর পর বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার শুরু হলে দেশের পোশাক রপ্তানিও বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অর্ধমাস উৎপাদন বন্ধ থাকলেও পোশাক রপ্তানিতে তার প্রভাব পড়েনি, বরং পরের মাস আগস্টে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সেই থেকে পরের বছরের মে পর্যন্ত পোশাকের রপ্তানি ইতিবাচকই থাকে এবং এই দশ মাসের সাত মাসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয় ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ৮০ শতাংশের মধ্যে। তবে ২০২৫ সালের জুন মাসে রপ্তানি কমে যায় ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ, যদিও সার্বিকভাবে বছরটিতে প্রবৃদ্ধি হয় ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে যায় এবং এর পর ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা ৮ মাস পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা চলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই মাস পরে অর্থাৎ গত এপ্রিলে হঠাৎ করেই পোশাক রপ্তানিতে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়, কিন্তু মে মাসে ফের ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে যায় রপ্তানি। ৯ মাসই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ায় সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার্বিকভাবে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে যায় এবং এ খাতে আয় হয় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক খাতের এই উত্থান-পতনের মধ্যে কারখানা যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমন নতুন কারখানাও খুলেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ বছর দুই মাসে পোশাক খাতে কারখানা বন্ধ হয় ২৫৬টি, আর নতুন কারখানা চালু হয় ৩২৩টি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে কারখানা বন্ধ হয় ৩৫টি, ২০২৪ সালে ৭৭টি, ২০২৫ সালে ১৪১টি এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনটি কারখানা বন্ধ হয়।
অন্যদিকে ২০২৩ সালে ১৩৫টি, ২০২৪ সালে ১০৬টি, ২০২৫ সালে ৮৫টি এবং এবছরের প্রথম দুই মাসে ১৮টি নতুন কারখানা চালু হয়, যার ফলে ফেব্রুয়ারি শেষে বিজিএমএইতে সচল কারখানার সংখ্যা উন্নীত হয় ২ হাজার ১২৭টিতে। এর বাইরে বিজিএমইএ এর সদস্য নয়—এমন আরও শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে গত তিন বছরে, যেসব কারখানার প্রতিটিতে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।
এই মন্দার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস। ইউরোস্ট্যাট-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে পোশাক কেনা কমিয়েছে। এ সময় তারা বিশ্ববাজার থেকে ২৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কিনেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কম। বাংলাদেশের এ বড় বাজারে চার মাসে রপ্তানি হয় ৬ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম, অথচ ২০২৫ সালের চার মাসে বাজারটিতে ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার হয়; যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউরোপের বাজারে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল এবং প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। যদিও অন্যান্য বাজারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিদায়ী অর্থবছরে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে দশমিক ৯১ শতাংশ ও কানাডায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে বাংলাদেশের পোশাকের। অর্থবছরটিতে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্যে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার ও কানাডায় ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে অন্যান্য দেশের রপ্তানিও খুব একটা বেড়েছে তা না, সবার রপ্তানি কমেছে। ডনাল্ড ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল শুল্ক নীতির কারণে বিশ্বব্যাপী যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তার প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা অনেক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যান্য দেশ রপ্তানিতে সামনে আসছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে অবনমন ঘটছে। এটা আমাদের জন্য অশনীসংকেত।’ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বাংলাদেশে ব্যবসার খরচও বেড়েছে মন্তব্য করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমছে না, বাড়ছে। গ্লোবাল ও স্থানীয় কারণে আমাদের রপ্তানি কমছে বলে আমি মনে করি।’ চলতি অর্থবছরের বাজেটে রপ্তানি বাড়াতে বন্ড সুবিধা উন্মুক্ত করা ও ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে দ্রুত পণ্য ছাড়, বন্ডেড ওয়্যারহাউজে কাঁচামাল সংরক্ষণের সীমা বাড়ানোর মত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, গেল শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে পোশাকখাতে ব্যবসা করা লিথি গ্রুপের সফল কারখানা অ্যাপারেল-২১ সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যায়। বছর চারেক ধরেই রপ্তানি ক্রয়াদেশ কম থাকায় সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারেনি কোম্পানিটি এবং লোকসানের ধকল সামাল না দিতে পেরে একপর্যায়ে বন্ধের নোটিস টানানো হয়। একইভাবে গত কোরবানির ঈদের পর বন্ধ হয় আল মুসলিম গ্রুপের কারখানা, তাতে ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারায়। কারখানা চালাতে না পেরে বন্ধ হয় গাজীপুরের ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িং ও ইউনিক ডিজাইনার্স। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর সে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গ্রুপ বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান এবং নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদার এখন কারাগারে রয়েছেন। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় তারল্য সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে এ দুটো গ্রুপের বড় বড় কারখানা। ক্রমাগত কারখানা বন্ধের এই প্রভাব পড়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শিল্প অংশে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে , যেখানে আগের অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বিজিএমইএ সভাপতি হাসান মাহমুদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বন্ধ কারখানার চিত্র তো দেখা যায়। অনেক কারখানা আছে, যেগুলো লোকসান দিয়ে চলছে। চাইলেই তো কারখানা বন্ধ করা যায় না। এসব কতোদিন চলতে পারবে তাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের হুটহাট দাম বাড়ানো শিল্পের জন্য ভালো না। এখন যারা পারবে, তারা ব্যবসা করবে।’ পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমছে, নতুন কারখানা কি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “ব্যবসার উত্থান-পতন হবে, হাতবদল হবে, পুরনো কারখানা বন্ধ হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে—এটাই হয় সবসময়। ঘাটতি পূরণ হবে কি না তা মোটাদাগে বলা কঠিন। যদি কোনো স্টাডি হয়, তাহলে একটি চিত্র উঠে আসবে হয়ত।” তিনি জানান, কারখানা বন্ধ হওয়ায় গত ছয় মাসে ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
বিজিএমএইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, কোভিড মহামারীর পর ইউক্রেন যুদ্ধে সার্বিকভাবে পোশাকের চাহিদা কমেছে, সেই ধাক্কা বাংলাদেশের অনেক কারখানায় পড়েছে। এর সঙ্গে কারখানার নিজস্ব অদক্ষতাও দায়ী। তিনি বলেন, ‘একেকটা কারখানার বন্ধ হওয়ার ইতিহাস আলাদা আলাদা। কেউ বন্ধ করেছে, আর লোকসানে টানতে চাচ্ছে না। কেউবা উপায় না পেয়ে। আবার উৎপাদন সীমিত করে কারখানা চালু রাখলে তাতে মুনাফা হলেও অনেকে করতে চাচ্ছেন না। এর সঙ্গে জ্বালানির বিষয়টিও জড়িত।’ বর্তমানে কারখানা কেন বন্ধ হচ্ছে এবং পোশাক খাতে এর প্রভাব কী তা নিয়ে সমীক্ষা করছে বিজিএমইএ, যা চলতি জুলাই মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে এবং এর ফাইন্ডিংসগুলো শেয়ার করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে তা হুটহাট করে হয়নি বলে মনে করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এখনো অনেক বড় বড় কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা এ থেকে পরিস্থিতি উৎরাতে না পারলে সামনে কর্মসংস্থানে বড় চাপ আসতে পারে। শিল্প খাতে শ্রমিক কমে গেলে অন্য খাতের শ্রমে প্রভাব পড়বে এবং সার্বিকভাবে মজুরি কমে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত জ্বালানির বিষয়টি সমাধান করতে পারলে উদ্যোক্তাদের মাঝে আশার সঞ্চার হবে বলে মনে করেন তিনি।
ডেনিম এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘অর্ডার যেমন কমছে, এটা সত্য, তেমনি কারখানাভেদে অনেক ইস্যু রয়েছে। অনেকে এখনো পুরনো প্রযুক্তি নিয়ে ব্যবসা করছে, তাদের টিকে থাকা কঠিন। এখন খাতকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’ ঠিক কোন খাতে সরকারের সহযোগিতা দরকার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি হতে হবে কেইস বেসিস। কারো জ্বালানির প্রয়োজন, কারো এর চেয়ে বেশি দরকার অর্থায়ন। তাই সঠিক চিত্র বের করতে প্রয়োজন সমীক্ষা।’
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিটিং ও টেক্সটাইল মিলিয়ে প্রতি মাসেই ৩-৪টি কারখানা বন্ধের খবর আসছে। দেশে এখন রাজনৈতিক সরকার এসেছে। অনেক কারখানাও নতুন করে আসছে, আরও আসবে। সার্বিকভাবে খাতটির জন্য একটি রোডম্যাপ দরকার, যাতে মাঝারি ও ছোট কারখানা টিকে থাকতে পারে।
এসএ