ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ, ২২ জনের মৃত্যু
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম আপডেট: ১০.০৭.২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে গত চার দিনে পাহাড়ধস ও দুর্যোগজনিত ঘটনায় জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতভিটা, ফসলের মাঠ, সবজিক্ষেত ও চিংড়ির ঘের। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় পাহাড়ধসে দুই শিশু নিহত হয়। তারা সম্পর্কে আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাইবোন। নিহতরা হলো বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫), তিনি মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌসিফ (১০), তিনি আবদুল মজিদের ছেলে। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড়ধস—দুই সংকটে মানুষ আতঙ্কিত। গত দুই দিন ধরে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক।

জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। 

অন্যদিকে পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের পানির নিচে চলে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

মাতামুহুরী ও পেকুয়ার কয়েকটি বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।

রামু উপজেলায় বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রধান সড়ক ও অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাদেক মাহমুদ সিমরান বলেন, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছেন। বাড়িঘর ও সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। বাজারঘাট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে।

চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা করিম উল্লাহ বলেন, পাঁচদিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তাঘাট পানির নিচে থাকায় চলাচল অত্যন্ত দুর্ভোগের হয়ে উঠেছে।

সাহারবিল এলাকার কৃষক মনির আহমেদ বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

অটোরিকশাচালক মুজিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রী নেই বললেই চলে। সারাদিন গাড়ি চালিয়েও সংসার চালানোর মতো আয় হচ্ছে না।

চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না, শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।

মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ বলেন, চার দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। তাই পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ইউএনও শাহীদ দেলোয়ার বলেন, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা উভয় নদীর বিপৎসীমার চেয়ে বেশি। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। শুধু চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় মোট ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সময়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটায় সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এসএ


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707296 Advertisement: 41053012; 01550707291, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝