ফুটবল দলীয় খেলা হলেও অনেক সময় ব্যক্তিগত দ্বৈরথই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন ও বেলজিয়ামের ম্যাচেও এর ব্যতিক্রম নয়। ইউরোপের দুই পরাশক্তির এই লড়াইয়ে সবার নজর থাকবে স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল এবং বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার মুখোমুখি লড়াইয়ে।
স্পেনকে গোলের দেখা পেতে হলে ভাঙতে হবে কোর্তোয়া নামক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। অন্যদিকে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় ভরসা কোর্তোয়াই। দলকে জয়ের হাসি উপহার দিতে ইয়ামালকে সারাক্ষণ কড়া নজরে রাখতে হবে অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষককে। ফলে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশ সময় আজ (১০ জুলাই) রাত ১টায় শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে দলীয় কৌশলের পাশাপাশি ইয়ামাল–কোর্তোয়ার ব্যক্তিগত দ্বৈরথও হয়ে উঠতে পারে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৮। অন্যদিকে বেলজিয়াম গোলরক্ষক কোর্তোয়ার বয়স ৩৪। এই শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া ইয়ামাল যখন ফুটবল শুরু করেছেন, কোর্তোয়া ততদিনে পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। ফলে তারা আসলে দুটি ভিন্ন প্রজন্মের প্রতিনিধি। কোর্তোয়া তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শেষ করার অপেক্ষায়। অন্যদিকে ইয়ামালের সবে বিশ্বকাপ মাতানো শুরু। তবে এই সময়ে ক্লাব ফুটবলেও দুজনের মুখোমুখি দ্বৈরথ থাকে আলোচনায়। কোর্তোয়া অনেক দিন ধরেই রিয়াল মাদ্রিদের পোস্টের নিচে আস্থার নাম। আর ইয়ামাল গত তিন মৌসুম ধরেই বার্সেলোনার আশা ভরসার নাম।
২০১৮ বিশ্বকাপে সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতার পরই চেলসি থেকে রিয়ালে নাম লেখান কোর্তোয়া। টানা ৮ বছর বেশ আস্থার সঙ্গে লস ব্লাঙ্কোসদের পোস্ট সামলাচ্ছেন তিনি। এই সময়ে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও তিনটি লা লিগা শিরোপা জিতেছেন। এর আগে আলতেলিকো মাদ্রিদের হয়েও একবার লা লিগা জিতেছেন। চেলসির হয়ে জিতেছেন দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। সব মিলিয়ে প্রাপ্তি ও অর্জনে ভরা এক ক্যারিয়ার কোর্তোয়ার। ২০১৮ বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে সেরা সাফল্য পায় বেলজিয়াম (তৃতীয় স্থান)। যে সাফল্যে কোর্তোয়ার ভূমিকা ছিল অনন্য।
তবে এবারের বিশ্বকাপে কোর্তোয়াকে এখন পর্যন্ত খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। ব্যতিক্রম ছিল কেবল রাউন্ড অব বত্রিশে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ। যে ম্যাচে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে তারা জয় তুলে নেয়। এরপর শেষ ১৬-এ যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে বেলজিয়াম। বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও ২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে অবশ্য বেলজিয়ামকে স্পষ্টতই আন্ডারডগ। শেষ ষোলোতে যারা বার্নার্দো সিলভা ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর দলকে হারিয়েছে।
অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল হয়তো এখনো লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ডদের মতো আলো ছড়াতে পারেননি। তবে স্পেনের জয়ে ঠিকই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এখন পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে তার গোল ১টি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় তুলে নিতে যিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী। তবে কোর্তোয়া যে তাদের জন্য ম্যাচটা কঠিন করে তুলবেন, সেটা বেশ ভালোভাবেই মাথায় রাখছেন তিনি।
স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মুন্দো দেপোর্তিভোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেছেন, ‘থিবো কোর্তোয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। তিনি আমার জন্য ম্যাচটি কঠিন করে তুলবেন। কিন্তু সব সময়ের মতো এবারও আমি জিততে চাই।’
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ইয়ামালকে প্রসংশায় ভাসিয়েছেন কোর্তোয়া। এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষকের কথায়, ‘আমরা জানি, ওয়ান অন ওয়ান পরিস্থিতিতে লামিন ইয়ামাল অবিশ্বাস্য মেধাবী, সে ভীষণ ক্ষিপ্র এবং প্রয়োজনে দুজনকে সহজে কাটাতে পারে।’
রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকরা স্বাভাবিকভাবে বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সাফল্য দেখতে চায় না। তবে বিশ্বকাপের সময় বিষয়টা ব্যতিক্রম। এখানে সবাই তো স্পেনের প্রতিনিধি। এরপরও স্পেন-বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালে অনেক রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকই নীরবে কোর্তোয়ার দারুণ একটি পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা করবেন। কারণ রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের কাছে কোর্তোয়া শুধু বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক নন, বরং তিনিই সেরা। চ্যাম্পিয়নস লিগসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের নায়ক হয়েছেন।
আবার দীর্ঘ দিন ধরে পরিবার নিয়ে কোর্তোয়ার বাস স্পেনে। ফলে তার নিজের জন্যও ম্যাচটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার। অবশ্য এই ম্যাচটায় শুধু বেলজিয়ামবাসীর হাসিটাই প্রধান চাওয়া কোর্তোয়ার, ‘আমি স্পেনে ১১ বছর আছি। অবশ্যই, এটা অনেক সময়। সেখানে জীবন কিছুটা ধীর গতির, আবহাওয়া ভালো, কিন্তু আমি বেলজিয়ামেই রয়ে গেছি। যদিও স্পেন আমার দ্বিতীয় বাড়ি এবং সম্ভবত ক্যারিয়ার শেষে সেখানেই থিতু হব। আমার ছেলে বাচ্চা স্বাভাবিকভাবেই বেলজিয়ানের চেয়ে বেশি স্প্যানিশ। কিন্তু দিন শেষে এ ম্যাচে আমি বেলজিয়ানই।’
এসএ