ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
কক্সবাজারে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মৃত্যুঝুঁকি
✎ অবজারভার প্রতিনিধি
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩২ পিএম আপডেট: ০৯.০৭.২০২৬ ৫:৩৬ পিএম
X

পর্যটন শহর কক্সবাজারে ঢুকতেই কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে চার লেনের দুটি আলাদা সড়ক চোখে পড়ে। একটি প্রধান সড়ক, অপরটি বাইপাস সড়ক। বাইপাস সড়কটি পাহাড় কেটে কলাতলী পর্যটন জোন হয়ে পুনরায় প্রধান সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দুই সড়ক ধরে এগোলে একসময় দেখা মিলত ঘন জঙ্গলবেষ্টিত সারি সারি পাহাড়ের। শোনা যেত পাখপাখালির কলতান। দেড়-দুই দশক আগের সেই প্রকৃতি এখন কেবলই স্মৃতি।

এখন অধিকাংশ পাহাড় ঢেকে গেছে পাকা-আধাপাকা দালান ও ঝুপড়িঘরে। শুধু কক্সবাজার শহর নয়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কলাতলী থেকে মেরিন ড্রাইভ এবং কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দুই পাশের পাহাড়ের পাদদেশ দখল করে তৈরি হয়েছে বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা।

দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এসব বসতি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজার শহর, উখিয়া, টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ জেলার আট উপজেলায় পাহাড়ে ফাটল ও ধস দেখা দিচ্ছে।

গত রোববার দিবাগত রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত পাহাড় ধসে উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির, কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় ১৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সূত্র বলছে, জেলা সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালীতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। সাগর ও নদীভাঙনের শিকার হয়ে অনেকে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বসতি গড়ে তুলছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ের ঢাল বা পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের মানুষ। জীবিকার তাগিদে কিংবা মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি গড়েছেন।

কক্সবাজার শহরের লাইট হাউস পাহাড়ে বসবাসকারী রফিকুল ইসলাম জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুরি করে তাদের সংসার চলে। রাতে মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে পাহাড়ে বসবাস করতে হচ্ছে। তবে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্র অনুসারে, গত কয়েক দশকে টেকনাফে পাহাড় ধসে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। সেদিন টেকনাফের ফকিরামোরা, টুন্ন্যামোরা ও হ্নীলা সিকদারপাড়ায় পাহাড় ধসে ৩৪ জন নিহত হন। একই ঘটনায় দেড় শতাধিক বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।

২০০৯ সালের ৪ ও ৬ জুলাই ফকিরামোরা ও টুন্ন্যামোড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের চার সদস্যসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এরও আগে ১৯৮৯ সালে ফকিরামোরায় এক পরিবারের সাতজনসহ ১১ জন প্রাণ হারান।

বন বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় নতুন কোনো অবৈধ বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বন বিভাগ কাজ করছে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, “বর্ষা এলেই স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যেতে মাইকিং করে। এ ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।”

জেলায় পাহাড়ে অবৈধ বসতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বন বিভাগের সূত্রমতে, জেলার কুতুবদিয়া ছাড়া বাকি আট উপজেলার এক-তৃতীয়াংশই বনভূমি। একসময় জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে খ্যাত কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ বনভূমির বড় অংশ গত দুই দশকে দখল হয়ে গেছে।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের তথ্যমতে, গত দেড় দশকে এই বিভাগের ১৩ হাজার ৩৪৭ একর বনভূমি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের আওতাধীন ৭৬ হাজার ৪৫৭ একর বনভূমির মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে দখল হয়ে গেছে ১২ হাজার ৬০৫ একর।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ১ লাখ ২০ হাজার ৫৮৩ একর বনভূমির বড় অংশই দখল হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ হাজার একর বনভূমিজুড়ে রয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এসব আশ্রয়শিবিরের আশপাশের পাহাড়ও স্থানীয় ব্যক্তি ও এনজিও সংস্থার দখলে রয়েছে। এসব এলাকায়ও গড়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক জানান, তাদের সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৩ হাজার একর আয়তনের ছোট-বড় ৫১টি সরকারি পাহাড় কেটে প্রায় ৬৬ হাজার ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘরবাড়িতে বসবাস করছেন ৩ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছেন অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বন দখল ও পাহাড় কাটার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, “বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে উপজেলার পাহাড়ধসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে কীভাবে স্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, চার দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বাসিন্দাদের সরে আসার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। প্রয়োজনে জোরপূর্বক সরিয়ে আনা হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ চলছে। বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

এসইউ/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝