প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অভিষেক হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটি রেকর্ড ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করলেও, সংসদে যোগদানের পর কয়েকজন সংসদ সদস্য ও নেতার বিরুদ্ধে ওঠা নানান অভিযোগ দলটিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। সমালোচনার মুখে কয়েকটি ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে দলীয় এমপিদের জন্য কঠোর নৈতিক নির্দেশনা জারি করেছে জামায়াত।
দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সংসদের ভেতর ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন টকশো এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকায় বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগে একের পর এক বিতর্ক
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান (বাচ্চু)কে ঘিরে। ঐচ্ছিক অনুদানের তালিকায় তার মেয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি তার অজান্তে ঘটেছে। এরপর নিজের ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করেন এবং দল থেকেও তাকে সতর্ক করা হয়।
একই ধরনের অভিযোগ ওঠে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধেও। স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে তার নিকট আত্মীয়দের দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ওঠে। যদিও দলীয় নেতাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগে থেকেই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিষয়টি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সরকারি বরাদ্দের একটি সাইকেল নিজের নাতিকে দেওয়ার অভিযোগে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে বিতর্কিত সাইকেলটি প্রশাসনের কাছে ফেরত দিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে আত্মীয়কে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে সংসদে গৃহস্থালি সামগ্রী বরাদ্দের প্রসঙ্গ তোলায় আরেক সংসদ সদস্যও সমালোচনার মুখে পড়েন। দলীয় সূত্র জানায়, এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট এমপিকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
সংসদের ভেতরেও সমালোচনা
এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও জাতীয় সংসদে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন। ফলে বিষয়টি শুধু দলীয় অস্বস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সংসদীয় রাজনীতির আলোচিত ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।
তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, সব অভিযোগ একই ধরনের নয়। তাদের দাবি, কিছু ঘটনায় বাস্তবতা উপেক্ষা করে অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমপিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়েছে।
কঠোর বার্তা কেন্দ্রের
পরিস্থিতি সামাল দিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সব সংসদ সদস্যের উদ্দেশে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। সেখানে সরকারি অনুদান, ঐচ্ছিক তহবিল, আর্থিক সহায়তা কিংবা যেকোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ-পিএস) অথবা তাদের স্বজনদের সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কোনো আত্মীয় প্রকৃত অর্থেই সহায়তার যোগ্য হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যক্তিগত সুপারিশ না করে বিষয়টি দলীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি কোনো সরকারি নথি, ডিও লেটার বা সুপারিশপত্র ভালোভাবে যাচাই না করে স্বাক্ষর না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দল যা বলছে
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনের ভাষ্য, কয়েকটি ঘটনায় দল ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে অনেক অভিযোগ বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। তার দাবি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনেক সময় স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হয়।
অন্যদিকে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় জামায়াতে ইসলামী সবসময় গুরুত্ব দেয়। কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য সব পর্যায়ে সতর্কবার্তাও পাঠানো হয়েছে।
জনআস্থা ধরে রাখার পরীক্ষা
সংসদে প্রথমবারের মতো বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর জামায়াতের সামনে জনআস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আরও বড় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের কথা বলা দলটির জন্য নিজেদের সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।