চট্টগ্রাম বন্দরের অন্তত আড়াইশ কনটেইনারকে ঘিরে এমন এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, কাস্টমস ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব নিরাপত্তা-সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সন্দেহজনক ও রাজস্বসংশ্লিষ্ট প্রায় ২৫০টি কনটেইনার এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক অবস্থায় বন্দরে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, কনটেইনার গায়েব হয়নি; বরং কাস্টমসের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্য ও নথিপত্রে অসঙ্গতি রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-আসলেই কি কনটেইনার উধাও হয়েছে, নাকি এটি দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা?
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে চলতি বছরে নিলামে বিক্রি হওয়া দুটি কনটেইনার খুঁজে না পাওয়ার ঘটনায়। নিলাম ক্রেতা অর্থ পরিশোধের পর ইয়ার্ডে গিয়ে কনটেইনার না পেয়ে অভিযোগ করেন। এরপর কাস্টমস বন্দরে লক ও আনলক অবস্থায় থাকা অন্যান্য চালানের অবস্থান যাচাই করতে গিয়ে আরও অনেক কনটেইনারের হদিস না পাওয়ার দাবি তোলে।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, চার বছরে ২০২১ সালে ৮৩টি, ২০২২ সালে ৬১টি, ২০২৩ সালে ৪০টি এবং ২০২৪ সালে ৬৬টি- মোট প্রায় ২৫০টি কনটেইনার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব সাধারণ আমদানি চালান নয়। অধিকাংশই ছিল সন্দেহজনক ঘোষণার কারণে কাস্টমসের নজরদারিতে থাকা চালান। সাধারণত কোনো চালানে পণ্যের ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি বা অন্য অনিয়মের সন্দেহ দেখা দিলে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে তার ডেলিভারি লক করে দেওয়া হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব কনটেইনার বন্দর এলাকা থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।
অর্থাৎ, যদি সত্যিই এসব কনটেইনার বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে বের হয়ে থাকে, তবে তা কেবল রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়; বরং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী-পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)। এখানে প্রতিটি কনটেইনারের প্রবেশ, অবস্থান ও বহির্গমন একাধিক স্তরের তদারকির আওতায় থাকার কথা। কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, নিরাপত্তা ইউনিট এবং ডিজিটাল ডেটাবেজ-সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।
এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যেও যদি শতাধিক কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং পুরো ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
কাস্টমসের দাবি, কাগজে থাকা কনটেইনার বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং এ বিষয়ে একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব মেলেনি।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, কাস্টমস যে ২৫০টি চালানের কথা বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ২৪৭টি। তাদের দাবি অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কনটেইনার ইতোমধ্যে কাস্টমস আউটপাসের মাধ্যমে খালাস হয়েছে, কিছু প্রাইভেট ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং বাকিগুলো এখনও বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি কনটেইনার নম্বর ও বিল অব লেডিং নম্বরে ভুল তথ্য থাকার কথাও জানিয়েছে বন্দর।
এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, বিরোধের মূল জায়গা কেবল কনটেইনারের অবস্থান নয়; বরং তথ্য সংরক্ষণ, ডেটা সমন্বয় এবং নথিপত্রের নির্ভুলতাও।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার গায়েব হওয়ার অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। অতীতেও এমন অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু দায়ীদের চিহ্নিত করা বা অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশের নজির খুব একটা নেই। ফলে একই ধরনের অভিযোগ পুনরায় সামনে আসায় তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে এখানে ট্র্যাকিং, নিরাপত্তা বা নথি ব্যবস্থাপনায় যে কোনো দুর্বলতা ব্যবসায়ীদের আস্থা, রাজস্ব আদায় এবং দেশের বাণিজ্যিক সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে সন্দেহজনক চালান যদি যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই বের হয়ে থাকে, তাহলে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য বাজারে প্রবেশ এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার যদি মূল সমস্যা নথিপত্র ও তথ্য ব্যবস্থাপনার হয়, তবে সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবির নিরপেক্ষ যাচাই। কোন কনটেইনার কোথায় আছে, কোনটি বৈধভাবে খালাস হয়েছে, কোনটি স্থানান্তরিত হয়েছে এবং কোনটির তথ্য ভুল- এসব বিষয় ডিজিটাল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, গেট লগ, আউটপাস ও শিপিং ডকুমেন্ট মিলিয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়ের সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর নিরাপত্তার ওপর জনআস্থারও একটি বড় পরীক্ষা। তাই অভিযোগ ও পাল্টা দাবির বাইরে গিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণই এখন সবচেয়ে জরুরি।
-টিএস