রাজধানীতে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। একের পর এক নৃশংস ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা তৎপরতার মাঝেও রাজপথে সক্রিয় রয়েছে এক হাজার বাসেরও বেশি পেশাদার ছিনতাইকারী। ভোর ও মধ্যরাতে যাতায়াতকারী নগরবাসী এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি ঢাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুই নারী। পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেয়েকে নিয়ে ভোরে গাবতলীতে নামেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ইসলাম (৪২)। সেখান থেকে রিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারী তার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেয়। চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় ও কানে গুরুতর আঘাত পান তিনি। চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ১১ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই নারী।
এর মাত্র দুইদিন আগে, ঈদুল ফিতরের ঠিক আগে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা করতে বের হয়ে একই নির্মমতার শিকার হন উত্তরার বাসিন্দা মুক্তা আক্তার (২১)। ফায়দাবাদের বাসা থেকে অটোরিকশায় যাওয়ার পথে উত্তরা দক্ষিণ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি প্রাইভেটকার থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। রাস্তায় আছড়ে পড়ে গুরুতর আহত মুক্তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, ‘তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিগত অনেক সময়ের তুলনায় বর্তমানে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।’
ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া মনোভাবের প্রমাণ মিলছে খোদ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায়। গত ১৬ জুন আদাবরের একটি দোকানে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনার পর পুলিশ অভিযানে নামলে অপরাধীরা উল্টো পুলিশকে কুপিয়ে জখম করে। এতে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ কুমার গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশের পাল্টা গুলিতে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় ৪১৮টি ছিনতাইয়ের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৪টি মামলা হয়েছে আগস্ট মাসে এবং সবচেয়ে কম ২৫টি ফেব্রুয়ারি মাসে।
অন্যান্য মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়—২০২৫ সালের জুনে ৩৯টি, জুলাইয়ে ৪৩টি, সেপ্টেম্বরে ৪২টি, অক্টোবরে ৩১টি, নভেম্বরে ৩৬টি, ডিসেম্বরে ২৮টি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৩০টি, মার্চে ২৯টি, এপ্রিলে ২৬টি ও মে মাসে ৩৫টি মামলা হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ ছিল তেজগাঁও বিভাগ, যেখানে সর্বোচ্চ ১০৬টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ওয়ারীতে ৯১টি, মতিঝিলে ৭৩টি, মিরপুরে ৩৯টি, রমনায় ৩৪টি, উত্তরা বিভাগে ৩০টি, গুলশানে ২৮টি এবং সবচেয়ে কম ১৭টি মামলা হয়েছে লালবাগ বিভাগে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ, অনেক সময় থানা থেকে মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা হারানোর জিডি করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা মূল পরিসংখ্যানে আসে না।
ডিএমপির কাউন্টিং অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে ১ হাজার ৩৮৭ জন চিহ্নিত ছিনতাইকারী সক্রিয়। যার বড় অংশই ওয়ারী বিভাগে (৩০৮ জন)। এছাড়া তেজগাঁওয়ে ২৪০, উত্তরা বিভাগে ২৪০, মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুরে ৫৩ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে। এদের প্রায় ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার এজাহারনামীয় আসামি।
ওয়ারী বিভাগের এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ের কারণে এই অঞ্চলে যানজটে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে মোবাইল বা ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়া ভোরবেলা দূরপাল্লার যাত্রীরা এখানে বেশি ছিনতাইয়ের শিকার হন। তিনি জানান, মে মাসে ১৩৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হলেও তারা জামিনে বের হয়ে আবার একই পেশায় জড়াচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কুতুবখালী পকেট গেটটি বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ছিনতাইকারীদের এই দ্রুত জামিন পেয়ে যাওয়া এবং পুনরায় অপরাধে জড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘ছিনতাইকে সহজে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখার সময় এখন আর নেই। এরা এখন সুসংগঠিত, মাদকাসক্ত এবং এদের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে। তারা শুধু সম্পদ লুটছে না, মানুষকে হত্যা করছে।’
অপরাধ দমনে শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী নয়, বরং এদের পেছনের গডফাদার ও হোতাদের আইনের আওতার আনার তাগিদ দেন তিনি। একই সাথে থানায় মামলা না নিয়ে জিডি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা এবং এই অপরাধ অর্থনীতির পেছনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারও স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান এই অপরাধবিজ্ঞানী।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ানোর দাবি করেছে ডিএমপি। তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখন একদিন পরপরই টার্গেটেড এলাকায় ‘ব্লক রেইড’ বা চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অপরাধীরা সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ বা মানিকগঞ্জ থেকে এসে অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ তাদের ধাওয়া করে ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও গ্রেফতার করছে।
অন্যদিকে, ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধে বিট পুলিশিং ও নজরদারি কমিটি গঠনের পাশাপাশি নিয়মিত টহল ও গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে। তবে ঢাকার বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় লজিস্টিক সাপোর্টের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যতম বড় এই শহরের তুলনায় আমাদের সেই পরিমাণ জনবল নেই। পুলিশের জনবল, যানবাহন এবং টেকনিক্যাল সাপোর্ট আরও বাড়ানো গেলে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।’
এসএ