বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বাংলাদেশের শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর জন্য বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা এ লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বন্ধ শ্রমবাজার খোলার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার পর এবার সরকারের মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের বাজার। এরই অংশ হিসেবে দীর্ঘ ৩২ মাস ধরে বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ থাকা ওমানের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে চলতি মাসেই ওমান যাচ্ছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে সামনে রেখে দেশটির বাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু করতেও এই দুই নীতিপ্রণেতা মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক জানান, মালয়েশিয়ার পর এখন সরকারের নজর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। চলতি মাসের ১১ তারিখ ওমান সফরে গিয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ অন্যদের সঙ্গে বন্ধ শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে বৈঠক করবেন তিনি। এই সফর ফলপ্রসূ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বর্তমানে আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত আছেন, যা দেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেই আছেন ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। বর্তমানে সৌদি আরবে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭ থেকে ১২ লাখ, ওমানে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার, কাতারে প্রায় ৪ লাখ, কুয়েতে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এই সংখ্যায় মাঝে মাঝে ওঠানামা দেখা যায়।
ওমানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা এক বাংলাদেশি জানান, বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নেওয়া বন্ধ থাকায় তারা চরম সংকটে আছেন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাতে পারছেন না। অন্য দেশের কর্মীদের পারিশ্রমিক বেশি, আবার বাংলাদেশিরা যেভাবে পরিশ্রম করে অন্যরা সেভাবে পারে না। ফলে সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নিলে প্রবাসী ব্যবসায়ী ও দেশ—উভয়ই লাভবান হবে। আরেক প্রবাসী মো. মোমিন জানান, প্রায় ৩২ মাস ধরে দেশটিতে সাধারণ ভিসা বন্ধ রয়েছে। বাজারে কর্মীদের যথেষ্ট চাহিদা থাকলেও দালালদের দৌরাত্ম্য ও নানাবিধ জটিলতায় সাধারণ বাংলাদেশিরা সেখানে যেতে পারছেন না। ওমানে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক অভাব রয়েছে এবং বাজারটি খুললে বহু বাংলাদেশি কাজ করার সুযোগ পাবেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় সেদেশে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তারা নানাবিধ সমস্যায় পড়ছেন এবং বিষয়টিতে তাদের নজর রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা মোতাবেক ধাপে ধাপে বন্ধ থাকা সব দেশেই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাড়াতে যে দেশে যে পেশার মানুষের চাহিদা রয়েছে, সেই মোতাবেক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর পথেই হাঁটছে সরকার।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ওমান সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন সব ধরনের ভিসা ইস্যু স্থগিত করে। ২০২৪ সালের জুনে চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষক ও বিনিয়োগকারীসহ নির্দিষ্ট ৮টি পেশার জন্য ভিসা আংশিক শিথিল করা হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ভিসা এখনো পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন ওয়ার্ক ভিসা এবং ট্যুরিস্ট ভিসার ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ জারি থাকলেও যারা বর্তমানে সেখানে বৈধ রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে আছেন, তাদের ভিসা নবায়নে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কুয়েতে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ কাজের ভিসা বা ফ্যামিলি ভিসা পাওয়া অত্যন্ত জটিল। বিশেষ সরকারি প্রজেক্ট বা ক্লিনিং কোম্পানির মতো নির্দিষ্ট কিছু সেক্টর ছাড়া সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য নতুন ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না। এছাড়া লেবানন ও ইয়েমেনে চলমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার কারণে এই দুটি দেশে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সব ধরনের ভিসা ইস্যু সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
তবে সংকটের এই সময়ে শ্রমবাজারে বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে কাতারে। সম্প্রতি ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশ-কাতার সপ্তম যৌথ কমিটির বৈঠকে কাতার সরকার বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান ও ওয়েল্ডিং—এই চারটি সেক্টরে কর্মী নিতে বিশেষ জোর দিয়েছে দেশটি। বর্তমানে কাতারে প্রায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন, যার মধ্যে ৩০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে এবং বাকিরা অন্য পেশায় নিয়োজিত। ২০২৩ সালে ১ লাখ ৭ হাজার ৫৯৮ জন বাংলাদেশি কর্মী কাতারে গিয়েছেন এবং চলতি বছর কাতার কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যার দ্বিগুণ কর্মী গ্রহণ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ছাড়াও কাতারে অদক্ষ কর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ইতিমধ্যে দুটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
উক্ত বৈঠকে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে কাতারগামী কর্মীদের জন্য বর্তমানে ঢাকায় মাত্র একটি ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। স্বল্প সময়ে ভিসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে কাতারের ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের জন্য কাতারের শ্রমমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান তিনি। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কাতারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানানো হবে। এ ছাড়াও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী মো. নুরুল হক কাতারের চলমান উন্নয়নযজ্ঞে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, কেয়ারগিভার, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের জন্য আহ্বান জানান।
এদিকে, গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ সময় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের কল্যাণ ও অধিকার সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন তারা। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে অনুরোধ জানান তিনি।
এসএ